
বিএনপি’র নাম ভাঙ্গিয়ে এক শ্রেণীর সুবিধাবাদীরা দলের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে বলে অভিযোগ উঠেছে দলটির কিছু নেতা এবং পাতি নেতা দের বিরুদ্ধে। দলের ভেতরে অনুপ্রবেশকারী হাইব্রিড নেতাদের নানান অপকর্মের কারণে ভাবিয়ে তুলছে বিএনপির হাইকমান্ড সিনিয়র নেতাদের। হাইব্রিড নেতারা দলের নাম ভাঙিয়ে চাঁদাবাজি, দখলবাজি, মাদক ব্যবসায় নিয়ন্ত্রণ, থানা থেকে আসামি ছাড়িয়ে নেয়াসহ নানা অপকর্ম করছে। যার দায়ভার নিতে হচ্ছে বিএনপি’র ! তবে দলটির সিনিয়র নেতাকর্মীরা দাবী করে বলছেন, সু-সংগঠিত এই দলটির নাম ভাঙ্গিয়ে নানা অপকর্ম করে দলের সুনাম ও ভাবমূর্তি নষ্ট করতে উঠেপড়ে লেগেছে সুবিধাবাদী একটি স্বার্থন্বেষী মহল। দলের সিনিয়র নেতারা বলছেন, ভালো কাজের মাধ্যমে সকলের মন জয়ের পাশাপাশি জনপ্রিয়তা অর্জন করে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় যেতে চায় বিএনপি।রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধির জন্য দলীয় নেতাকর্মীদের বারবার তাগিদ দিচ্ছে বিএনপির হাইকমান্ড। দলের নীতিনির্ধারকদের এই প্রত্যাশা পূরণে ‘বাধা’ হয়ে দাঁড়িয়েছেন মাঠপর্যায়ের কিছু হাইব্রিড নেতাকর্মী। তাদের দখলদারিত্ব ও চাঁদাবাজি এবং নানা অপকর্মসহ বিভিন্ন কারণে বিএনপিতে মাথাচাড়া দিচ্ছে অভ্যন্তরীণ কোন্দল আর গ্রুপিং। এর কারনে কিছুটা হলেও ক্ষুণ্ন হচ্ছে দলের ভাবমূর্তি। দখল-চাঁদাবাজি ও প্রভাব বিস্তার কেন্দ্র করে নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব এখন প্রকাশ্যে আসছে। দিনকে দিন দলীয় নেতাকর্মীদের গ্রুপিং, অন্তঃকোন্দল রূপ নিচ্ছে মারামারি এবং সংঘর্ষে। উচ্ছৃঙ্খল নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে কাজে আসছে না বিএনপির ‘জিরো টলারেন্স নীতি’। চূড়ান্ত শাস্তি হিসেবে বহিষ্কারের মতো পদক্ষেপ নিলেও নেতাকর্মীদের বাগে আনতে হিমশিম অবস্থা বিএনপির নীতিনির্ধারকদের।জানা গেছে, গত ৫ আগস্ট স্বৈরাচার শেখ হাসিনার পতনের পর সারা দেশে নানা ধরনের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এসকল সংঘর্ষে বিভিন্ন সময়ে বিএনপি তৃণমূলের নেতাকর্মীদের পাশাপাশি দলের ভেতরে অনুপ্রবেশকারী হাইব্রিড নেতাদের নাম উঠে আসে। বিভিন্ন অভিযোগের প্রেক্ষিতে অনেক নেতাকর্মীদেরকে বহিষ্কার করা হয় দল থেকে! অনেকের বিরুদ্ধে আবার মামলাও করে ভুক্তভোগীরা। সূত্রে জানা গেছে, ঘটনা ১) রূপনগর এলাকায় চাঁদাবাজির পৃথক দুই ঘটনায় দুই বিএনপি নেতাকে আটক করেছে পুলিশ। এ বিষয়ে রূপনগর থানায় দুটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। পুলিশ জানায়, শুক্রবার (২০ ডিসেম্বর) রাতে রূপনগর আবাসিক এলাকার ২৭ নম্বর রোডে একটি রিকশার গ্যারেজের দারোয়ান আব্দুল জলিলের কাছে ৫০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করেন স্বেচ্ছাসেবকদল নেতা শামীম ও তার সহযোগীরা। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে মারধর করে আহত করা হয়। অন্যদিকে, রূপনগরের আরেক ঘটনায় ঠিকাদার কফিল উদ্দিনের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। চাঁদা না দেওয়ায় তাকেও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে বিএনপির মিরপুর ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক আহ্বায়ক ও রূপনগর থানা বিএনপির সদস্য ইউসুফ মাতবরসহ অভিযুক্ত দুইজনকে আটক করেছে পুলিশ।
ঘটনা ২) রাজধানীর মিরপুরে চাঁদাবাজিতে বাধা দেওয়ায় সেলিনা আক্তার নামে মহিলা দলের এক নেত্রীর ওপর হামলা ও তাকে শ্লীলতাহানির অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় যুবদল নেতাদের বিরুদ্ধে।মিরপুর ১ নম্বরে চশমার দোকানে যুবদল নেতারা চাঁদা চাইতে গেলে বাধা দেন সেলিনা ও তার স্বামী। এ ঘটনায় ওই দিন রাতে সেলিনা ও তার স্বামীর ওপর অতর্কিত হামলা চালান কতিপয় যুবদল নেতারা। সেলিনা মিরপুর থানা মহিলা দলের সদস্য সচিব। এ ঘটনায় বুধবার রাজধানীর মিরপুর মডেল থানায় ৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দেন সেলিনা।
ঘটনা ৩) রাজধানীর মিরপুরের দারুসালামের ঐতিহ্যবাহী গোলারটেক (ইদগাহ) মাঠে দখল করে মাসব্যাপী নগর কৃষি ও কুটিরশিল্প বাণিজ্য মেলার আয়োজন চলছে। এখনো পুলিশ প্রশাসনের কাছ থেকে অনুমতি না পেলেও মেলার সার্বিক নিরাপত্তার দায়িত্ব নিয়েছেন দারুস সালাম থানা বিএনপির যুগ্ন আহবায়ক ও ৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থী পরিচয়ে এম ইমরান হোসেন। একদিকে মাঠকে কেন্দ্রকরে মাদকের ভয়াল থাবা অন্যদিকে সুস্থ বিনোদনের অন্তরায় মেলার নামে এমন মাঠ দখল কোনভাবেই মেনে নিতে পারছে না এলাকাবাসী।
ঘটনা ৪)১০ নভেম্বর সুবাহান মিয়ার ছেলে বোরহান উদ্দিনকে থানা থেকে ছাড়াতে শাহ আলী থানা বিএনপির আহ্বায়ক কাউসার আহমেদ পাপ্পুর মধ্যস্থতায় সুবাহানের স্ত্রী ৯৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আফসারুল আলম সেলিমের মাধ্যমে শাহ আলী থানার সাবেক ওসিকে ৮০ হাজার টাকা পাঠান। পরের দিন বোরহান উদ্দিনকে ডিএমপি অধ্যাদেশের ৭৭/১০০ ধারায় (পাচানিতে) কোর্টে চালান দেওয়া হয়। এ ঘটনায় দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের সুস্পষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে বিএনপি নেতা পাপ্পু ও সেলিমকে ১৯ নভেম্বর মঙ্গলবার ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির দপ্তর সম্পাদক স্বাক্ষরিত কারণ দর্শানো নোটিশ দেওয়া হয়ে। পরে নোটিশের সঠিক জবাব ও সদুত্তর না দিতে পারায় দল থেকে বহিষ্কার করা হয় পাপ্পুকে।
বিভিন্ন সময়ে নানা অপকর্মের সাথে কতিপয় বিএনপির রাজনৈতিক নেতা পাতি নেতাদের সম্পৃক্ত থাকায় পুলিশ হাত গুটিয়ে নিচ্ছে বলেও অভিযোগ করছেন ভুক্তভোগীরা। তারা বলছেন, রাজনৈতিক সম্প্রীত থাকায় তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা ও মামলা নিতে অনেক সময় অনিহা প্রকাশ করে পুলিশ। তবে, পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা বলছেন, পুলিশের হাত গুটিয়ে থাকার কোন সুযোগ নেই। যে কারো বিরুদ্ধে মামলা বা অভিযোগ হলে তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছে সে যে দলেরই হোক অপরাধ করলে কাউকেই ছাড় দেওয়া হচ্ছে না সুজোগও নেই।
তবে বিএনপির কেন্দ্রীয় দপ্তরের তথ্যানুযায়ী, ৫ আগস্টের পর সারা দেশে হাজারের উপরে নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে হাজারের উপর শোকজ, প্রায় ৯”শ বেশি বহিষ্কার, কয়েক শতাধিক নেতা কর্মীরদের পদ স্থগিত ও শতাধিক নেতাকর্মীকে সতর্ক এবং অনককে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের নোটিশ দেওয়া হয়েছে।