
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) জয়ের আভাস ও রাজনৈতিক ডামাডোলের মধ্যেই রাজ্য সচিবালয় নবান্নে নজিরবিহীন নিরাপত্তার চিত্র দেখা গেছে। রাজ্য সরকারের গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র বা ফাইল যাতে কোনোভাবে লোপাট বা নষ্ট না হয়, তা নিশ্চিত করতে নবান্নসহ সব সরকারি অফিসে কেন্দ্রীয় বাহিনী ও পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
সোমবার (৪ মে) সকাল থেকেই নবান্নের প্রতিটি প্রবেশ ও বহির্গমন পথে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়। সরকারের মুখ্যসচিবের বিশেষ নির্দেশনার পর এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
মুখ্যসচিবের জারি করা এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, সচিবালয় বা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কোনো দপ্তর থেকে কোনো নথি সরানো, নষ্ট করা বা ফটোকপি করা যাবে না। এমনকি কোনো নথির স্ক্যান কপিও করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নির্দেশনায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, কোনো বিভাগে নথিপত্র নিয়ে এদিক-সেদিক হলে সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় প্রধানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।
নবান্নে কর্মরত প্রতিটি কর্মীকে আজ ব্যাপক তল্লাশির মুখোমুখি হতে হয়েছে। প্রবেশের সময় পরিচয়পত্র যাচাই করার পাশাপাশি বের হওয়ার সময় কর্মীদের ব্যক্তিগত ব্যাগ এবং শরীর তল্লাশি করা হচ্ছে। এক সরকারি কর্মী গণমাধ্যমকে জানান, আগে কখনো নবান্নের ভেতরে কেন্দ্রীয় জওয়ানদের এভাবে ব্যাগ বা ফাইলপত্র চেক করতে দেখিনি। আজ বডি সার্চও করা হচ্ছে।
এপিবি আনন্দের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, চিটফান্ড কেলেঙ্কারি বা শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতির মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর ফাইল যাতে সরিয়ে ফেলা না যায়, তার জন্যই এই বিশেষ সতর্কতা। সরকার বদলের সন্ধিক্ষণে কোনো অসাধু চক্র যাতে প্রমাণ নষ্ট করতে না পারে, পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী যৌথভাবে সেই নজরদারি চালাচ্ছে।
উল্লেখ্য, এবারের নির্বাচনে বিপুল ভোটদানের হারের পর পশ্চিমবঙ্গে বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছিল। সেই প্রেক্ষাপটে নবান্নের এই কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও নথিপত্র রক্ষায় কেন্দ্রীয় বাহিনীর অবস্থানকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মনে করছে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
এবারে দুদফায় বিধানসভা নির্বাচনে ভোটগ্রহণ হয়েছে পশ্চিমবঙ্গে। প্রথম দফায় গত ২৩ এপ্রিল ভোটগ্রহণ হয় দার্জিলিং, কালিম্পং, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার, দক্ষিণ দিনাজপুর, মালদা, কোচবিহার, মুর্শিদাবাদ, বীরভূম, পশ্চিম বর্ধমান, পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, ঝাড়গ্রাম, পশ্চিম মেদিনীপুর এবং পূর্ব মেদিনীপুরে।
দ্বিতীয় দফায় ভোটগ্রহণ হয় গত ২৯ এপ্রিল। ভোটগ্রহণ হয় নদিয়া, উত্তর ২৪ পরগনা, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, কলকাতা, হাওড়া, হুগলি এবং পূর্ব বর্ধমানে। দুই দফাতেই এবার রেকর্ড হারে ভোটদান হয়। ২০২১-এর বিধানসভা ভোটের তুলনায় ২০২৬-এ ভোটার সংখ্যা ৫১ লক্ষ কমলেও, গতবারের তুলনায় এবার প্রায় ৩১ লক্ষ ভোট বেশি পড়েছে।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে প্রায় ৮২ শতাংশ ভোট পড়েছিল। আর এবার ২০২৬-এ গড়ে ভোট পড়েছে প্রায় ৯৩ শতাংশ। অর্থাৎ, গতবারের তুলনায় এবারের নির্বাচনে প্রায় ১১ শতাংশ ভোট বেশি পড়েছে। এই বিপুল ভোটদান নজিরবিহীন এবং সর্বকালীন রেকর্ড। শতাংশের পাশাপাশি রেকর্ড তৈরি হয়েছে সংখ্যার হিসাবেও। ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে এরাজ্য়ে মোট ভোটার ছিলেন ৭ কোটি ৩৪ লক্ষ। এসআইআর-এর জেরে এবার ভোটার সংখ্যা কমে হয়েছে প্রায় ৬ কোটি ৮৩ লক্ষ। অর্থাৎ, ২০২১-এর তুলনায় এবার ৫১ লক্ষ ভোটার কমেছে।
তবে মোট ভোটার কমলেও প্রদত্ত ভোট চোখে পড়ার মতো বেড়েছে। ২০২১-এ ভোট দিয়েছিলেন ৬ কোটি ৩ লক্ষ ভোটার। আর, এবার মোট ভোট দিয়েছেন ৬ কোটি ৩৪ লক্ষ ভোটার। ২ দফা মিলিয়ে ২০২১-এর তুলনায় ভোটদাতার সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৩১ লক্ষ। প্রথম দফায় যে ১৬টি জেলায় ভোট হয়েছে, ২০২১-এর তুলনায় সেই জেলাগুলিতে, প্রায় সাড়ে ২১ লক্ষ বেশি ভোট পড়েছে। আর, দ্বিতীয় দফার ৭ জেলায় বেশি ভোট পড়েছে প্রায় সাড়ে ৯ লক্ষ।