1. ajkerkagojbd22@gmail.com : Ajker Jagoj : Ajker kagoj
  2. asikkhancoc085021@gmail.com : asikengg :
  3. minniakter1@gmail.com : minni akter : minni akter
  4. : temp-login-BxH6QyEPU5XH7Ed :
লর্ডসে ফিক্সিংয়ের ১৫ বছর: পাকিস্তানি ক্রিকেটে ট্র্যাজেডির পতনগাথা - আজকের কাগজ
মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ০৯:৫৮ পূর্বাহ্ন

লর্ডসে ফিক্সিংয়ের ১৫ বছর: পাকিস্তানি ক্রিকেটে ট্র্যাজেডির পতনগাথা

রিপোর্টার নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর, ২০২৬ ৯:০৯ এএম
শেয়ার করুন

লর্ডসে সাজানো নো বল ও কলঙ্কিত অধ্যায়

পাড়ার ক্রিকেটে ক্রিজ আঁকা হয় ইটের টুকরা বা সাদা চক দিয়ে। বোলার দৌড়ে এসে বল করার সময় পা বোলিং ক্রিজের দাগের ওপাশে চলে গেলে আশপাশের সবাই চেঁচিয়ে ওঠে নো বল। সাধারণ খেলায় নো বল মানে বাড়তি এক রান, একটি অতিরিক্ত বল আর বোলারের অনাকাঙ্ক্ষিত ভুল। কিন্তু ২০১০ সালের ২৬ আগস্ট লন্ডনের ঐতিহাসিক লর্ডস টেস্টে যে তিনটি নো বল হয়েছিল, তা আর দশটা সাধারণ নো বলের মতো ছিল না। এগুলো ভুল ছিল না, বরং আগে থেকে লেখা এক কলঙ্কিত চিত্রনাট্যের বাস্তবায়ন ছিল। সেই নো বলের মূল্য শেষ পর্যন্ত দিতে হয়েছিল পাকিস্তানের তৎকালীন তারকা ক্রিকেটার সালমান বাট, মোহাম্মদ আসিফ এবং তরুণ পেসার মোহাম্মদ আমিরকে। ২০১১ সালের ৩ নভেম্বর লন্ডনের আদালতে তাঁদের সাজা ঘোষণার মাধ্যমে ক্রিকেট বিশ্বের অন্যতম আলোচিত স্পট ফিক্সিং কেলেঙ্কারির চূড়ান্ত অধ্যায় রচিত হয়। ওভারস্টেপ হয়েছে কি না, তা নিয়ে বিকেলের ঝগড়া সন্ধ্যা পর্যন্ত গড়ায়। দুই দিন পর, ৩ নভেম্বর বিচারক জেরেমি কুক সাজা ঘোষণা করেন। পিসিবির তৎকালীন চেয়ারম্যান শাহরিয়ার খান জরিমানা ও নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিয়ে তাঁদের থামান।

গোপন বৈঠক ও নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ডের অনুসন্ধান

ঘটনার সূত্রপাত অবশ্য ক্রিকেট মাঠে হয়নি। লন্ডনের এক গোপন বৈঠকে ব্রিটিশ ট্যাবলয়েড নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ডের সাংবাদিকেরা এক অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে ছদ্মবেশে যোগাযোগ করেন পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের প্লেয়ার এজেন্ট মাজহার মাজিদের সঙ্গে। গোপন ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিওতে দেখা যায়, মাজিদ সাংবাদিকদের সামনে টাকার বান্ডিল গুনছেন এবং নিশ্চিত করছেন যে লর্ডস টেস্টে আমির ও আসিফ কখন নো বল করবেন। তিনি জানান, কোন ওভারের কত নম্বর বলে নো বল করা হবে তা আগে থেকেই ঠিক করা আছে, যাতে জুয়াড়িরা পূর্বপরিকল্পিতভাবে বাজি ধরতে পারে। এই চক্রান্ত বাস্তবায়নে সম্পূর্ণ ম্যাচের ফল পরিবর্তন করারও প্রয়োজন ছিল না, শুধু নির্দিষ্ট বলের গতিপথ নির্ধারণ করলেই চলত। সাংবাদিকেরা নিজেদের পরিচয় দিয়েছিলেন ক্রিকেটে অর্থ বিনিয়োগে আগ্রহী ধনী ব্যবসায়ী হিসেবে। সাংবাদিকেরা গোপনে ক্যামেরা চালু রেখেছিলেন। একটি নির্দিষ্ট বল কখন নো হবে, সেটি জানাই যথেষ্ট। চারজনের বিরুদ্ধেই অভিযোগ ছিল জুয়ায় প্রতারণার ষড়যন্ত্র এবং দুর্নীতির বিনিময়ে অর্থ গ্রহণের। সাবেক অধিনায়ক রশিদ লতিফ বলেছিলেন, ফাঁস হওয়া ভিডিওতে কিছু অস্পষ্টতা আছে।

লর্ডস টেস্টের বাস্তবায়ন ও গ্রেফতার

২০১০ সালের ২৬ আগস্ট লর্ডসে শুরু হয় ইংল্যান্ড ও পাকিস্তানের মধ্যকার চতুর্থ টেস্ট। সাংবাদিক ও পাঠকদের কাছে দেওয়া মাজহার মাজিদের ভবিষ্যদ্বাণী পুরোপুরি মিলে যায় মাঠে। ইনিংসের তৃতীয় ওভারের প্রথম বলেই আম্পায়ারের সিগন্যাল আসে নো বল, ওভারস্টেপ করেন ১৮ বছর বয়সী তরুণ পেসার মোহাম্মদ আমির। দেখা যায়, বোলিং ক্রিজের সীমানা থেকে আমিরের পা প্রায় আধা মিটার সামনে বেরিয়ে গিয়েছিল, যা যেকারো চোখেই ছিল চরম অস্বাভাবিক। এরপর দলের দশম ওভারের ষষ্ঠ বলে একই কাণ্ড ঘটান অভিজ্ঞ পেসার মোহাম্মদ আসিফ। দুটি সুনির্দিষ্ট পূর্বাভাস এবং মাঠের দুটি বাস্তবায়ন ক্রিকেট বিশ্বকে স্তব্ধ করে দেয়। আর দর্শকদের কাছে সামান্য বিরক্তির কারণ। আমিরের পা বেরিয়ে গেল বোলিং ক্রিজের সীমারেখার বাইরে। মাঠের দর্শকেরা তখনো জানতেন না, এই বলগুলোর পেছনে কত বড় চিত্রনাট্য।

স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের তদন্ত ও প্রাথমিক অস্বীকার

নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ড গোপন ভিডিও ও প্রমাণ প্রকাশ্যে আনলে তোলপাড় শুরু হয় ক্রিকেট বিশ্বে। স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড দ্রুত অভিযানে নেমে গ্রেপ্তার করে এজেন্ট মাজহার মাজিদকে। এর পরপরই পুলিশি তদন্তের আওতায় আসেন তিন পাকিস্তানি ক্রিকেটার—অধিনায়ক সালমান বাট, পেসার মোহাম্মদ আসিফ ও মোহাম্মদ আমির। জিজ্ঞাসাবাদের পাশাপাশি তাঁদের মুঠোফোনও জব্দ করা হয়। তবে শুরুতে পাকিস্তান দলের পক্ষ থেকে এই অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করা হয়েছিল। পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের তৎকালীন সভাপতি ইজাজ বাট দাবি করেছিলেন যে খেলোয়াড়েরা নির্দোষ। এমনকি যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত পাকিস্তানের হাইকমিশনার ওয়াজিদ শামসুল হাসান দাবি তুলেছিলেন যে, তাঁদের ক্রিকেটারদের চক্রান্ত করে ফাঁদে ফেলা হয়েছে। অনেকেই তাঁকে ভবিষ্যতের বড় তারকা ভাবতে শুরু করেছিলেন।

প্রতিভার অপমৃত্যু ও ক্রিকেটীয় শাস্তি

সেই সময় পাকিস্তান ক্রিকেটে মোহাম্মদ আমিরকে নিয়ে স্বপ্নের অন্ত ছিল না। মাত্র ১৮ বছর বয়সে বাঁহাতি এই পেসার দুর্দান্ত গতি, সুইং ও নিয়ন্ত্রণে বিশ্ব ক্রিকেটের উদীয়মান তারকা হয়ে উঠেছিলেন। ২০০৯ সালের টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপজয়ী পাকিস্তান দলের সদস্য ছিলেন তিনি। অন্যদিকে মোহাম্মদ আসিফ ছিলেন বলকে দুদিকে সুইং করানোর এক অনন্য কারিগর, যাঁর বলে তৎকালীন সময়ের সেরা ব্যাটসম্যানরাও পরাস্ত হতেন। আর সালমান বাট ছিলেন দলের ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক ও শীর্ষ সারির ব্যাটসম্যান। ২০১০ সালের ৪ সেপ্টেম্বর আইসিসি এই তিন ক্রিকেটারকে সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করে। পরবর্তীতে ২০১১ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি আইসিসির স্বাধীন ট্রাইব্যুনাল শুনানির পর সালমান বাটকে ১০ বছর, আসিফকে ৭ বছর এবং তরুণ আমিরকে ৫ বছরের জন্য সব ধরনের ক্রিকেট থেকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। কী ঘটেছিল সেদিন, কীভাবে ধরা পড়েছিলেন ক্রিকেটাররা, আর এত বছর পর কোথায় দাঁড়িয়ে সেই তিন জীবন। গতি, নিয়ন্ত্রণ, আত্মবিশ্বাস—সব মিলিয়ে পাকিস্তানের ক্রিকেটে নতুন এক বিস্ময়ের নাম হয়ে উঠছিলেন আমির। বলকে দুই দিকে সুইং করানোর দক্ষতায় ব্যাটসম্যানদের নাভিশ্বাস তুলে দিতে পারতেন। হকি মাঠের অপূর্ণ স্বপ্ন আর ক্রিকেটের বিশ্বজয়ী সাম্রাজ্য: অন্য এক শাহরুখ খানের গল্প।

যুক্তরাজ্যের ফৌজদারি বিচার ও কারাদণ্ড

আইসিসির ক্রিকেটীয় নিষেধাজ্ঞাতেই ঘটনার সমাপ্তি ঘটেনি। ব্রিটিশ পুলিশের ফৌজদারি তদন্তের পর মামলা গড়ায় লন্ডনের সাউথওয়ার্ক ক্রাউন কোর্টে। ২০১১ সালের ১ নভেম্বর বিচারে পিসিবি অধিনায়ক সালমান বাট ও পেসার মোহাম্মদ আসিফ দোষী সাব্যস্ত হন। এর আগেই অবশ্য আমির এবং মাজহার মাজিদ নিজেদের অপরাধ স্বীকার করে নিয়েছিলেন। ৩ নভেম্বর আদালত তাঁদের জেলদণ্ড প্রদান করেন। সালমান বাটকে ৩০ মাস, আসিফকে ১ বছর, আমিরকে ৬ মাস এবং এজেন্ট মাজহার মাজিদকে ২ বছর ৮ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। আধুনিক ক্রিকেটে স্পট ফিক্সিংয়ের দায়ে কোনো আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারের কারাগারে যাওয়ার এটিই প্রথম নজির।

কারামুক্তি ও অপরাধ স্বীকারের অধ্যায়

সাজা কাটানোর পর একে একে কারাগারের দরজা খুললেও ক্রিকেটে ফেরার পথ তাঁদের জন্য সহজ ছিল না। মোহাম্মদ আমির কারাদণ্ডের অর্ধেক সময় পার করে ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে মুক্তি পান। মে মাসে মুক্তি পান আসিফ এবং জুন মাসে সাত মাসের কারাভোগ শেষে মুক্ত হন সালমান বাট। তবে দীর্ঘ দিন তাঁরা অপরাধ অস্বীকার করে আসছিলেন। অবশেষে ২০১৩ সালে লাহোরে এক সংবাদ সম্মেলন ডেকে প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে নিজের দোষ স্বীকার করে ক্ষমা চান সালমান বাট। এর আগে স্পোর্টস কোর্ট অব আরবিট্রেশনে (সিএএস) তাঁর ও আসিফের আপিল খারিজ হয়ে যায়। এরপর করাচি প্রেসক্লাবে এসে আনুষ্ঠানিকভাবে নিজের ভুল স্বীকার করেন আসিফও।

মাঠে ফেরা ও খেলোয়ারদের পরবর্তী জীবন

২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে আইসিসির নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ শেষ হলে আসিফ ও বাট ঘরোয়া ক্রিকেটে ফেরার অনুমতি পান। বললেন, নিষেধাজ্ঞা শেষ হলে ক্ষতি মেরামতের চেষ্টা করবেন।

২০১৬ সালের জানুয়ারিতে প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটে নেমেই সেঞ্চুরি হাঁকান সালমান বাট।

পরবর্তীতে তিনি ধারাভাষ্য ও টিভি বিশ্লেষক হিসেবে কাজ শুরু করেন এবং পিসিবির বিভিন্ন প্যানেলেও যুক্ত হন। তবে আমিরের মাঠে ফেরার পথটি ছিল সবচেয়ে কঠিন। পাকিস্তান দলে পুনর্নির্বাচনের সময় জাতীয় দলের অনেক জ্যেষ্ঠ সতীর্থ তাঁর সঙ্গে একই অনুশীলনে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। শত বাধা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফিরলেও ২০১৯ সালে মাত্র ২৭ বছর বয়সে টেস্ট থেকে অবসর নেন আমির। এরপর ২০২০ সালে সাদা বলের ক্রিকেট ছেড়ে দিলেও ২০২৪ সালের টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপের আগে সাময়িক অবসর ভেঙে মাঠে ফেরেন। অন্যদিকে আসিফ আর কখনো জাতীয় দলে ফিরতে পারেননি, তবে ২২ টেস্টে ১০৫ উইকেটের মালিক আসিফকে ক্রিকেট ইতিহাস অন্যতম প্রভাবশালী সুইং বোলার হিসেবেই মনে রাখে। ২০১৬ সালে পাকিস্তান দলের সঙ্গে ইংল্যান্ড সফরের ভিসা পান আমির, যে দেশে জেল খেটেছিলেন, সেখানেই ফিরলেন। অনুশীলনে তাঁর সঙ্গে নামতে রাজি হননি কয়েকজন সতীর্থ।

দুর্নীতিবিরোধী ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন

লর্ডসের এই কলঙ্কিত ঘটনা কেবল তিন ক্রিকেটারের জীবনই শেষ করেনি, বরং আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দুর্নীতির বিরুদ্ধে আইসিসির লড়াইয়ের ধরনও বদলে দিয়েছিল। ঘটনার পর আইসিসি তাদের দুর্নীতিবিরোধী ইউনিটকে (আকসু) আরও শক্তিশালী করে। ক্রিকেটারদের বাধ্যতামূলক দুর্নীতিবিরোধী প্রশিক্ষণ দেওয়া, বুকিদের সন্দেহজনক যোগাযোগ শনাক্ত করা এবং জুয়াড়িদের পক্ষ থেকে আসা যে কোনো প্রস্তাব তাৎক্ষণিকভাবে আকসু কিংবা সংশ্লিষ্ট বোর্ডকে জানানো বাধ্যতামূলক করা হয়। পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডও নিজস্ব নীতিমালায় বড় ধরনের সংস্কার আনে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) তদন্তে অবশ্য ‘জবাব দেওয়ার মতো যুক্তি’ খুঁজে পাওয়া গেল।

বর্তমান প্রেক্ষাপট ও ক্রিকেট বিশ্বের চ্যালেঞ্জ

১৫ বছর আগের সেই শিক্ষা ক্রিকেট বিশ্বকে অনেক বেশি সতর্ক করলেও স্পট ফিক্সিংয়ের ভূত সম্পূর্ণ তাড়ানো সম্ভব হয়নি। ২০১৮ সালে পাকিস্তানের শারজিল খান পাকিস্তান সুপার লিগে (পিএসএল) ফিক্সিংয়ের দায়ে নিষিদ্ধ হন। ২০২০ সালে উমর আকমলও দুর্নীতিবিরোধী বিধি লঙ্ঘনের কারণে নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েন। ২০২০ সালে এক সাক্ষাৎকারে আসিফ আক্ষেপ করে বলেছিলেন, তাঁর আগেও ফিক্সিং হয়েছে এবং পরেও হয়েছে, অথচ সবাইকে শুধরে দেওয়ার উদ্যোগ সেভাবে সফল হয়নি। লর্ডসের সেই ঐতিহাসিক ঘটনা স্মরণে আনলে আজও একটি বিষয় স্পষ্ট হয়, প্রলোভনের মুখে সততা বজায় রাখা এবং খেলাটির চেতনা রক্ষা করাই ক্রিকেট বিশ্বের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

এই বিভাগের আরো খবর