1. ajkerkagojbd22@gmail.com : Ajker Jagoj : Ajker kagoj
  2. asikkhancoc085021@gmail.com : asikengg :
  3. minniakter1@gmail.com : minni akter : minni akter
১৫০–২০০ জনকে হত্যা করতে দেখেছেন জিয়াউলের দেহরক্ষী - আজকের কাগজ
রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬, ১২:০২ পূর্বাহ্ন

১৫০–২০০ জনকে হত্যা করতে দেখেছেন জিয়াউলের দেহরক্ষী

অনলাইন ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬ ৯:১২ পিএম
শেয়ার করুন

ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষী থাকা অবস্থায় জাতীয় টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানকে ১৫০–২০০ জনকে হত্যা করতে দেখেছেন সেনাসদস্য ইমরুল কায়েস। যাঁদের গুলি করে ও ইনজেকশন দিয়ে হত্যা করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ আজ রোববার দেওয়া জবানবন্দিতে ইমরুল কায়েস এ তথ্য জানান। তিনি বলেছেন, বিবেকের তাড়নায়, সুষ্ঠু বিচারের স্বার্থে এবং সেই সঙ্গে কোনো সৈনিককে কখনই যেন তাঁর মতো পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে না হয়, সে জন্য তিনি জবানবন্দি দিয়েছেন।

আওয়ামী লীগ সরকারের সময় শতাধিক ব্যক্তিকে গুম করে হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জিয়াউলের বিরুদ্ধে পঞ্চম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন সেনাসদস্য ইমরুল কায়েস। গত ১৪ জানুয়ারি এই মামলায় অভিযোগ গঠন করেন ট্রাইব্যুনাল।

ইমরুল কায়েস জবানবন্দিতে বলেন, তিনি ২০০১ সালের ৫ এপ্রিল সেনাবাহিনীতে সৈনিক হিসেবে যোগদান করেন। ২০১০-২০১২ সাল পর্যন্ত র‍্যাব সদর দপ্তরে প্রেষণে কর্মরত ছিলেন। তাঁর ২০১০ সালের ১০ আগস্ট র‍্যাবে পোস্টিং হয়। তিনি জিয়াউল আহসানের রানার (দেহরক্ষী) থাকা অবস্থায় কাজ ছিল সব সময় তাঁর সঙ্গে থাকা। তাঁর সঙ্গে ইমরুল জাফলং বর্ডার, ডিজিএফআই অফিস, আর্মি সদর দপ্তর, ডিবি প্রধানের কার্যালয় (তখন ডিবির প্রধান ছিলেন মনিরুল ইসলাম) এসব স্থানে যেতেন। মাঝে মধ্যে সচিবালয়ে যেতেন। এ ছাড়া মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিকের (তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিরাপত্তা বিষয়ক উপদেষ্টা) বাসায় যেতেন।

ইমরুল বলেন, তারিক আহমেদ সিদ্দিকের সঙ্গে জিয়াউলের ভালো সম্পর্ক ছিল। তাঁর (তৎকালীন) প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গেও ভালো সম্পর্ক ছিল। জিয়াউল যখন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে যেতেন, তখন তাঁর গাড়িতে অস্ত্র-গুলি থাকত। কিন্তু তা তল্লাশি করা হতো না। এ ছাড়াও আওয়ামী লীগ নেতা মাহবুবুল আলম হানিফ, আমির হোসেন আমু এবং জাহাঙ্গীর কবীর নানকের সঙ্গেও জিয়াউল আহসানের ভালো সম্পর্ক ছিল।

ইমরুল কায়েস বলেন, তিনি রানার হিসেবে যোগদানের ২০-২৫ দিন পর রাত সাড়ে ১২টার দিকে জিয়াউল আহসান তাঁকে ফোন করে র‍্যাব-১-এর সামনে যেতে বলেন। সেখানে গিয়ে গাড়িতে ওঠার পর জিয়াউল আহসান তাঁকে বলেন, পেছনে একটি বস্তা আছে। বস্তাটি ফেলে দিতে হবে। ওই গাড়িতে র‍্যাব-১-এর সিও রাশেদ এবং ক্যাপ্টেন কাউসার ছিলেন। তাঁরা র‍্যাব-১ থেকে বের হয়ে টঙ্গীর আহসান উল্লাহ ওভারব্রিজের ওপর দিয়ে ডান দিকে মোড় নিয়ে রেলক্রসিংয়ে যান। তখন জিয়াউল আহসান বস্তা বের করতে বলেন ইমরুলকে। নামানোর পর দেখা যায়, বস্তায় ঠান্ডা একটি মৃতদেহ। পরে কয়েকজন ধরে মৃতদেহটি রেললাইনের ওপরে রাখেন। কিছুক্ষণ পর একটি ট্রেন চলে গেলে তাঁরাও চলে যান।

সাজানো অভিযান
ইমরুল বলেন, কয়েকবার জিয়াউল আহসান সুন্দরবন অভিযানে যান। সঙ্গে ইমরুলকেও নেওয়া হয়। একবার তাঁদের সঙ্গে র‍্যাব-৮-এর সদস্যরাও ছিলেন। তাদের বোট (নৌযান) থামার পর জঙ্গলের ভেতর থেকে ২-৩টি গুলির শব্দ আসে। তখন নির্দেশ দেওয়া হলে তাঁরাও গুলি করেন। ভাটা থাকার কারণে কাদায় হাঁটু পর্যন্ত দেবে যাচ্ছিল। সেখানে জিয়াউল আহসান, র‍্যাবের এডিজি (অপস) মুজিব, কমান্ডার সোহায়েল এবং গণমাধ্যমের সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা জঙ্গলের ভেতরের দিকে গেলে দেখা যায়, গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ২-৩ টি লাশ পড়ে আছে। এই অভিযানটি সাজানো মনে হয়েছিল ইমরুলের কাছে।

ইমরুল বলেন, ২০১১ সালে পবিত্র রমজান মাসে একদিন ইফতারের আগ মুহূর্তে জিয়াউল আহসান ফোন দিয়ে ইমরুলকে ক্যামেরা নিয়ে উত্তরা নর্থ টাওয়ারে যেতে বলেন। তিনি গিয়ে দেখেন চারজন লোককে ক্রসফায়ারে (কথিত বন্দুকযুদ্ধ) দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। যারা ডাকাতি করার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। এটাও সাজানো ছিল।

১১ জনকে হত্যার বর্ণনা দিতে গিয়ে ইমরুল বলেন, ২০১২ সালে তিনটি মাইক্রোবাসে করে তাঁরা ১১ জন আসামিকে নিয়ে জিয়াউলের নেতৃত্বে পোস্তগোলা আর্মি ক্যাম্প এলাকায় যান। সেখানে ১১ জনকে বোটে (নৌযান) ওঠানো হয়। ইমরুল কাছে গিয়ে দেখেন, এটি সেই বোট যেটি সুন্দরবন অভিযানে জলদস্যুরা ব্যবহার করেছিল। বোটটি নদীর মাঝখানে নিয়ে আগের মতো এই ১১ জনকে হত্যা করে পানিতে ফেলে দেওয়া হয়। ওই অভিযানে জিয়াউল, মেজর নওশাদ, স্কোয়াড্রন লিডার সাইফ, কমান্ডার সোহায়েল, এডিজি (অপস) মুজিব ছিলেন।

ইমরুল আরও বলেন, র‍্যাব-৪-এর সেফ হাউস থেকে দুজন আসামিকে দুটো মাইক্রোবাসে নেওয়া হয়। প্রায় আধ ঘণ্টা চলার পর গাড়িটি তিন মাথার মোড়ে এক জায়গায় থামানো হয়। একজন আসামিকে গাড়ি থেকে নামিয়ে জিয়াউল আহসান তাঁর মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করে হত্যা করেন। ওই আসামির মাথায় অনেক চুল থাকার কারণে মাথায় আগুন ধরে গিয়েছিল। তাঁদের পাঠিয়ে দিয়ে জিয়াউল আহসান অপর আসামিকে নিয়ে চলে যান। জিয়াউল যখন র‍্যাব-৪-এ ফেরত আসেন তখন ওই আসামি তাঁর সঙ্গে ছিল না। কিছু কিছু অভিযানে ইমরুলকে নিতেন না জিয়াউল।

গুলির পর লুঙ্গি খুলে পানিতে ফেলে দেওয়া
জবানবন্দিতে ইমরুল কায়েস বলেন, জিয়াউল আহসান তাঁকে একবার ফোন করে র‍্যাব-১-এর সামনে গিয়ে মাইক্রোবাসে উঠতে বলেন। তিনি গাড়িতে গিয়ে মেজর নওশাদ এবং দুইজন আসামিকে জম টুপি পরা অবস্থায় দেখতে পান। কিছুক্ষণ পর জিয়াউল আহসান গাড়িতে এসে ওঠেন। তাঁরা টঙ্গীর আহসান উল্যাহ মাস্টার ফ্লাইওভার হয়ে কাঁচপুর ব্রিজের ওপরে গিয়ে দাঁড়ান। জিয়াউল একজন আসামিকে গাড়ি থেকে নামিয়ে মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে পরপর দুটি গুলি করেন। আর ব্রিজ থেকে ফেলে দেওয়ার সময় তাঁর লুঙ্গি খুলে দেন। একইভাবে মেজর নওশাদ অপরজনকে গুলি করে হত্যা করেন এবং লুঙ্গি খুলে পানিতে ফেলে দেন।

বলেশ্বর নদীতে হত্যা
ইমরুল বলেন, তিনি বেশ কয়েক বার জিয়াউল আহসানের সঙ্গে বরিশালে গিয়েছেন। সেখানে র‍্যাব-৮-এর সহযোগিতায় পাথরঘাটায় চর দুয়ানি বাজার থেকে বলেশ্বর নদীর ভেতরে সাগরের মোহনায় গিয়ে কখনো দুইজন, কখনো তিনজন, কখনো চারজন টার্গেটকে (আসামি) হত্যা করে লাশ পানিতে ফেলে দেওয়া হতো। তাঁদের সিমেন্টের বস্তার সঙ্গে বেঁধে গুলি করে হত্যার পর নদীতে ফেলার আগে কমান্ডো নাইফ দিয়ে পেট চিরে ফেলা হতো।

টিএফআই সেল থেকে নিয়ে ভারতে হস্তান্তর
জবানবন্দিতে ইমরুল বলেন, ২০১২ সালের মাঝামাঝি র‍্যাব-১-এর টিএফআই সেল থেকে দুইজন আসামি নিয়ে তাঁরা জিয়াউল হকের নেতৃত্বে জাফলং সীমান্তে যান। দুজন আসামিরই হাত বাঁধা এবং মাথায় জমটুপি পরানো ছিল। রাত ২টার দিকে সেখানে পৌঁছালে ভারত থেকে দুজন আসামি নিয়ে সিভিল পোশাকে ৪-৫ জন লোক তাঁদের কাছে হস্তান্তর করেন। আর টিএফআই সেল থেকে নেওয়া দুজনকে ভারতীয়দের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ভারত থেকে প্রাপ্ত দুজনকে নিয়ে জিয়াউল আহসান ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেন। জাফলং সীমান্ত থেকে আনুমানিক ২৫-৩০ কিলোমিটার আসার পর গাড়ি থেকে একজনকে নামানো হয় এবং জিয়াউল তাঁকে গুলি করে রাস্তার পাশে ফেলে দেন। অন্যজনকে আরও ১০-১৫ কিলোমিটার যাওয়ার পর একইভাবে গুলি করে ফেলে দেন জিয়াউল।

বিডিআর সদস্যদের হত্যা
ইমরুল কায়েস বলেন, বিডিআর হত্যাকাণ্ডের পর সারা দেশে ‘অপারেশন রেবেল হান্ট’ নামে একটি অপারেশন পরিচালনা করা হয় পলাতক বিডিআর সদস্যদের ধরতে। ওই সময় জিয়াউল ৮-১০ জন বিডিআর সদস্যকে হত্যা করেন। তাঁদের ইনজেকশন পুশ করে এবং পোস্তগোলা ব্রিজের কাছে আর্মি ক্যাম্পের পাশে থাকা নদীতে নিয়ে সিমেন্ট ভরা দুই বস্তার সঙ্গে বেঁধে মাথায় গুলি করে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়।

ইলিয়াস আলীকে গুম
বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর বিষয়ে জবানবন্দিতে ইসরুল বলেন, ২০১২ সালের সম্ভবত ১৩ এপ্রিল র‍্যাব সদর দপ্তর থেকে একটি মাইক্রোবাসে করে জিয়াউল, মেজর নওশাদ, স্কোয়াড্রন লিডার সাইফসহ তাঁরা মহাখালী ফ্লাইওভারের কাছে যান। কাকে গাড়িতে পিক করা হবে, তা তিনি জানতেন না। জিয়াউল গাড়িতে বসে বিভিন্ন জায়গায় ফোন করছিলেন টার্গেট কখন আসবে তা জানতে। একটা পর্যায়ে জানা যায়, টার্গেট আসবে না। পরে সেখান থেকে তাঁরা চলে যান। পরদিন ইমরুল ৯ দিনের ছুটিতে যান। ছুটিতে থাকা অবস্থায় গণমাধ্যমে জানতে পারেন, ইলিয়াস আলী নামের বিএনপি একজন নেতাকে মহাখালী ওভারব্রিজ এলাকা থেকে অপহরণ করা হয়েছে। ছুটি শেষে কাজে ফিরে অন্যান্যদের মাধ্যমে জানতে পারেন, কোতের অস্ত্রের ইন-আউট রেজিস্টার এবং সিসিটিভি ফুটেজ জিয়াউল আহসান নষ্ট করে ফেলেছেন।

ইমরুল বলেন, একদিন জিয়াউল ফোনে তারেক আহমেদ সিদ্দিকীকে বলেন, ‘স্যার আপনাদের কথামতো ইলিয়াসকে গলফ করলাম, এখন আপনারা এমন করলে হবে? এর চেয়ে আমি কমান্ডো মানুষ, আমাকে জঙ্গলে পোস্টিং দিয়ে পাঠাই দেন, এটাই আমার ভালো”।

ইমরুল তাঁর জবানবন্দিতে বলেন, দেহরক্ষী থাকা অবস্থায় তিনি লক্ষ্য করেছেন, জিয়াউল আহসান বিভিন্নভাবে আসামিদের গুম করতেন। তিনি র‍্যাব-১-এর টিএফআই সেল থেকে আসা ব্যক্তিদের গুলি এবং ইনজেকশন দিয়ে হত্যা করতেন। এই ইনজেকশন প্রয়োগ করার কাজটি কখনো টিএফআই সেলের ভেতরে, কখনো গাড়িতে করা হতো। ইমরুল র‍্যাব থেকে চলে যাওয়ার পর স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেননি।

জবানবন্দির এ পর্যায়ে ইমরুল কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, ‘আমি দেশের জন্য শপথ গ্রহণ করেছি, প্রশিক্ষণও নিয়েছি। তবে তা কখনোই দেশের মানুষকে হত্যা করার জন্য নয়। আমি রানার হিসাবে দেখেছি, তিনি (জিয়াউল আহসান) ওই সময়কালে ১৫০-২০০ জন মানুষকে বিভিন্ন পন্থায় হত্যা করেছেন। আমি বিবেকের তাড়নায় এবং সুষ্ঠু বিচারের স্বার্থে জবানবন্দি প্রদান করেছি। আমি ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করি। কোনো সৈনিককে কখনই যেন আমার মতো পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে না হয়।’

এই বিভাগের আরো খবর