
রাজধানীতে অটোরিকশা অল্প দূরত্ব যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। তবে বেপরোয়া চালকদের কারণে সড়কে বাড়ছে দুর্ঘটনা ও তীব্র যানজট। ফলে অননুমোদিত এ অটোরিকশার বিরুদ্ধে ক্ষোভও বাড়ছে বহু মানুষের মনে। তবে নীরবে, দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়া অবৈধ চার্জিং কেন্দ্রগুলো এসব ব্যাটারিচালিত রিকশাকে টিকিয়ে রাখছে, আর এতে প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। সরকার বিদ্যুৎ সাশ্রয় করার লক্ষ্যে সরকারি অফিস আদালত সময় কমিয়ে এনেছে যেখানে, আর সেখানে অটো রিকশা গ্যারেজ গুলোতে চলছে বিদ্যুৎ চুরির মহা উৎসব এযেন দেখার কেউ নেই !
রাজধানী মিরপুরে বিভিন্ন স্থানে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগের ব্যবহারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ চুরি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। অসাধু চক্র, স্থানীয় প্রভাবশালী এবং ফুটপাতের হকার ও অটোরিকশা গ্যারাজ ব্যবসায়ীর একাংশ সরাসরি বৈদ্যুতিক খাম্বা বা লাইন থেকে হুকিংয়ের মাধ্যমে এই অবৈধ সংযোগ ব্যবহার করছে।মিরপুরে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ, মিটার টেম্পারিং ও হুকিংয়ের মাধ্যমে চুরির প্রবণতা বেড়েছে, যা সিস্টেম লস এবং দুর্ঘটনার কারণ।
একসময় অল্প খরচে চলাচলের সহজ মাধ্যম হিসেবে যে ব্যাটারিচালিত রিকশার যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা এখন রূপ নিয়েছে এক বিদ্যুৎ চুরির মহা বাজারে। মিরপুরের বিভিন্ন স্থানে শত শত গ্যারাজে মেইন বিদ্যুৎ লাইন কিংবা স্ট্রিটলাইট লাইন থেকে অবৈধ সংযোগ নিয়ে রাতের বেলায় রিকশাপ্রতি ১৫০–২০০ টাকায় চার্জিংয়ের ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে।
প্রতি বছর ঢাকার অননুমোদিত ব্যাটারিচালিত রিকশাগুলোর চার্জিং বাবদ লেনদেন হয় আনুমানিক ৪ হাজার কোটি টাকা। গ্যারাজ মালিকদের জন্য এটি যেমন লাভজনক ব্যবসা, সরকারের জন্য তেমনি ব্যাপক মাত্রার নজরবিহীন বিদ্যুৎ চুরির ভর্তুকির খাত। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন বলছে, মিটার ব্যবহার করুক কিংবা অননুমোদিত সংযোগে চলুক শহরের প্রায় সব বৈদ্যুতিক রিকশা চার্জিং স্টেশনই অবৈধভাবে পরিচালিত হচ্ছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি—ডেসকো—বিদ্যমান বিধি লঙ্ঘন করে যথাযথ যাচাই–বাছাই ছাড়াই আবাসিক এলাকায় অনেক চার্জিং স্টেশনকে বাণিজ্যিক বিদ্যুৎ সংযোগ দিচ্ছে।
রাজধানীর শেওড়াপাড়া, মিরপুর-১০, পল্লবী, রূপনগর, কালশি, কল্যাণপুর, শাহআলীর গুদাড়াঘাট, কিংসুক আবাসনের ভেতর, চিড়িয়াখানা রোড, কামাল হাউজিং, ৫৪/বক্সনগরের ভেতর, হাজীরোড, বেড়িবাঁধসহ বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিন ঘুরে অবৈধ চার্জিং পয়েন্টগুলোর বাস্তব চিত্র দেখা গেছে। কোনো গ্যারাজ বা চার্জিং স্টেশনেই নেই ন্যূনতম কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা যেকোনো সময় বিদ্যুতায়িত হয়ে মৃত্যুর মত দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। পরিবহন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ব্যাটারিচালিত তিনচাকার গাড়ির বন্ধের বিষয়ে স্পষ্ট নীতিমালা না থাকায় বর্তমান এই বিদ্যুতের সংকট তৈরি হয়েছে। তাদের মতে, রাজধানীতে এসব অটোরিকশাকে নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারলে ঢাকার পুরো পরিবহন ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। এ পরিস্থিতি ঠেকাতে প্রথমেই সব অনিয়ন্ত্রিত যান অটোরিকশা তৈরির কেন্দ্র ও চার্জিং স্টেশনগুলো আগে বন্ধ করতে হবে তবেই বিদ্যুতের সংকট কমবে।
মিরপুরের শাহআলী এলাকায় পরিস্থিতি সবচেয়ে প্রকট—সঙ্কীর্ণ অলিতে গলিতে শত শত অননুমোদিত গ্যারাজ চলছে। রাস্তার স্ট্রিটলাইট ও বৈদ্যুতিক খুঁটিই হয়ে উঠেছে এসব চার্জিং পয়েন্টের উৎস। ল্যাম্পপোস্ট থেকে ঝুলে থাকে মোটা তারের গোছা, খোলা জায়গায় ঝুলে থাকে চার্জিং অ্যাডাপ্টার। জাতীয় চিড়িয়াখানার কাছাকাছি রাস্তার ধারে বৈদ্যুতিক খুঁটি থেকে সরাসরি চার্জ নিচ্ছে এরকম অসংখ্য রিকশা দেখা গেছে। তবে একটি গ্যারাজের মালিক দাবি করেন, তার কার্যক্রম বৈধ। “তার মিটার আছে। কিন্তু আশপাশের বেশিরভাগ গ্যারাজই অবৈধ লাইন ব্যবহার করে। তবে অবৈধ সংযোগ ছাড়া গ্যারাজ চালানো সম্ভব নয় তাও শিকার করেন। ডেসকোর লোকজন আসে, কিন্তু ‘ম্যানেজ’ হয়ে যায়,” বলেন তিনি। হাজী রোডে রাস্তার দুই পাশে সারিবদ্ধ অটোরিকশা ঝুলন্ত তারে সংযুক্ত অবস্থায় চার্জ নিতে দেখা যায়। একজন গ্যারাজকর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,”বেশিরভাগ গ্যারাজেই মিটার আছে, কিন্তু অল্প কয়েকটি গাড়ি সেই মিটার ব্যবহার করে। রাস্তারধারে প্রায় সব রিকশাই অবৈধ লাইন থেকে চার্জ নেয়। লোক দেখানোর জন্য মিটার চলছে, কিন্তু আসল ব্যবসা চলে রাতের বেলা অবৈধ সংযোগে।
“বিদ্যুৎ আইন অনুযায়ী অবৈধ বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীর ৩ থেকে ৫ বছরের কারাদণ্ড এবং জরিমানার বিধান রয়েছে। তবে লোক দেখানো জরিমানা করে দায় সারেন ডেসকো কারাদণ্ড দেওয়া হলে এই অপরাধ অনেকটাই কমে আসতো বলে মনে করছেন অনেকে।
ডেসকোর সহকারী প্রকৌশলী শাহরিয়ার হোসেন “আজকের কাগজকে” বলেন, “ওই এলাকা থেকে অবৈধ চার্জিং পয়েন্টের অভিযোগ আগেও পেয়েছি, এখন নিয়মিত সকাল, দুপুর ও রাতে অভিযান চালাচ্ছি। “অবৈধ সংযোগ পেলেই জরিমানা করে বিদ্যুৎ লাইন বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে”। তবে “বারবার অভিযানের পরও অননুমোদিত চার্জিং স্টেশন ও অস্থায়ী গ্যারেজের সংখ্যা বেড়েই চলেছে কোনো ভাবে বন্ধ হচ্ছে না এসকল গ্যারেজ। এতে রাজধানীর রাস্তায় চলা আনুমানিক ১০ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশার অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার আরও ত্বরান্বিত হচ্ছে।