
মঙ্গলবার রাতের ডালাস মহাযুদ্ধ শুরুর ঠিক আগ মুহূর্তে মাঠের মনস্তাত্ত্বিক লড়াই তুঙ্গে তুলে দিলেন ফ্রান্সের হেড মাস্টার দিদিয়ের দেশম। স্প্যানিশরা যেখানে ‘বল পজেশন’ বা বল নিজেদের পায়ে রেখে ফরাসিদের দম আটকে দেওয়ার ব্লু-প্রিন্ট সাজাচ্ছে, সেখানে দেশম সোমবার সংবাদ সম্মেলনে এসে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, বল নিজের পায়ে রাখার ঠ্যাকা ফরাসিদেরও কম নেই!
স্পেনের তিকিতাকাকে ভয় পেয়ে ফ্রান্স নিজেদের গুটিয়ে রাখবে এবং কাউন্টার অ্যাটাকের জন্য ওত পেতে বসে থাকবে, এমন সস্তা সমীকরণ এক তুড়িতে উড়িয়ে দিয়েছেন ফরাসি ড্রেসিংরুমের এই প্রধান সেনাপতি। দেশমের কথা, স্পেন হয়তো প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু আমরাও এমন একটা দল যাদের পায়ে বল রাখাটা ভীষণ প্রয়োজন। অর্থাৎ, মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার জন্য আজ এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হবে!
ফরাসি মাঝমাঠের তরুণ তুর্কি ওয়ারেন জায়ার-এমেরিও কোচের সুরে সুর মিলিয়ে বলেছেন, স্পেনের যেমন বলের ওপর নিয়ন্ত্রণ দারুণ, তেমনি ফ্রান্সেরও রয়েছে একাধিক অস্ত্র। কাউন্টার অ্যাটাক করা, বল নিজেদের পায়ে রাখা এবং নিরেট ডিফেন্স করা, ফরাসিরা সব পজিশনেই সেরা। ম্যাচের পরিস্থিতিই ঠিক করে দেবে তারা কোন অস্ত্রটি কখন প্রয়োগ করবে।
ফরাসিদের জন্য সবচেয়ে বড় সুসংবাদ হলো, মাঝমাঠের আসল ‘ইঞ্জিন’ অরেলিয়েন চুয়ামেনির দলে ফেরা! হ্যামস্ট্রিং ইনজুরির কারণে শেষ ষোলো ও কোয়ার্টার ফাইনালের মরক্কো ম্যাচ মিস করা রিয়াল মাদ্রিদের এই ২৬ বছর বয়সী তারকাকে নিয়ে দেশম জানিয়েছেন, ঝুঁকি এড়াতে আগের ম্যাচে ওকে খেলানো হয়নি। ও এখন অনেকটাই ভালো এবং যদিও ও এখনও ১০০ ভাগ ফিট নয়, তবে মঙ্গলবারের ম্যাচে সিলেকশনের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত। চুয়ামেনির শারীরিক শক্তি ও বল কেড়ে নেয়ার জাদুকরী ক্ষমতা স্প্যানিশ মিডফিল্ডের ওপর ফরাসি আধিপত্য বজায় রাখতে প্রধান ভূমিকা রাখবে।
এদিকে ফরাসি অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পেকে নিয়ে ছড়ানো হালকা দুশ্চিন্তার মেঘও কেটে গেছে। মরক্কো ম্যাচে গোড়ালিতে চোট পাওয়া এমবাপ্পে সোমবারের অনুশীলনে পুরো সময় না থাকায় ফ্যানদের মনে যে ভয় ধরেছিল, তা উড়িয়ে দিয়ে দেশম এক চিমটি রসিকতা করে বলেন, “কিলিয়ান একদম ঠিক আছে। ও অনুশীলন করেছে, তবে ১৫ মিনিটের ড্রিল ও ১০ মিনিটে শেষ করার অনুমতি পেয়েছিল, এই যা!”
স্পেনের স্বভাবসুলভ পাসিং ফুটবল মূলত প্রতিপক্ষকে এক পাশ থেকে অন্য পাশে দৌড় করিয়ে ক্লান্ত করে দেওয়ার জন্য ডিজাইন করা। ফরাসি রাইট-ব্যাক জুলেস কুন্দেও মনে করিয়ে দিয়েছেন, স্পেনের এই ক্লান্তি ছড়ানোর ফাঁদ রুখতে ফ্রান্সকে নিজস্ব পজেশনাল ফুটবল খেলতেই হবে। আগের ম্যাচে মরক্কোকে বোতলবন্দী করা মানু কোনে ও আদ্রিয়েন রাবিওর মিডফিল্ড জুটির সাথে চুয়ামেনির অন্তর্ভুক্তি ফরাসিদের মাঝমাঠে বাড়তি অক্সিজেন জোগাবে।
অতীতের ইউরো ২০২৪ ও ২০২৫ নেশনস লিগের সেমিফাইনালে স্পেনের কাছে হারের রেকর্ডকে ‘অতীত’ আখ্যা দিয়ে উড়িয়ে দিয়েছেন দেশম। তাঁর ক্ষুরধার মন্তব্য, অতীতের ম্যাচ থেকে নেয়ার মতো কোনো বিশেষ শিক্ষা নেই। সেই ম্যাচগুলোর বাস্তবতা ও ফুটবলারদের ফর্ম আলাদা ছিল। স্পেন জিতেছিল, তাদের অভিনন্দন; কিন্তু আমার আগ্রহ শুধুই সেমির ম্যাচটি নিয়ে।
টানা তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার সোনালী রেকর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে দেশম মনে করিয়ে দিলেন, ফুটবলে শেষ কথা হলো ‘মানিয়ে নেয়া’ বা অ্যাডাপ্টেশন। টেক্সাসের এটিঅ্যান্ডটি স্টেডিয়ামের সবুজ গালিচায় তিকিতাকার স্প্যানিশ নবাবদের বল কেড়ে নিয়ে এমবাপ্পের পায়ে সেই বল জোগাতে পারে কি না দেশমের মিডফিল্ড, নাকি স্পেনের পাসিং ফুটবলের গোলকধাঁধায় হারিয়ে যায় ফরাসি ফাইনালের স্বপ্ন—তার উত্তর মিলতে আর মাত্র কয়েক ঘণ্টার অপেক্ষা!
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা-রয়টার্স