
চরফ্যাশন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে সরকার কর্তৃক বরাদ্দকৃত বিভিন্ন খাতের অর্থ অপব্যবহার, অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে একটি কথিত সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বিভিন্ন অজুহাতে শিক্ষকদের কাছ থেকে অর্থ নেয়া হচ্ছে। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে শিক্ষকদের বিভিন্ন ফাইল আটকে দেয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। দীর্ঘদিন ধরে চলা এই অনিয়মে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে স্থানীয় শিক্ষক সমাজে।
জানা যায়, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে উপজেলার শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য বিভিন্ন ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার যে বিশেষ বরাদ্দ দেয়া হয়, তার সিংহভাগই লুটপাট করা হয়েছে। আন্তঃইউনিয়ন ফুটবল টুর্নামেন্ট এবং প্রাথমিক শিক্ষা পদক প্রতিযোগিতার ব্যয় নির্বাহের ক্ষেত্রে প্রতি বছর এসব প্রতিযোগিতার নামমাত্র খরচ দেখিয়ে বড় অঙ্কের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে উপজেলা শিক্ষা অফিসের এই শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। এছাড়াও প্রতিবন্ধী শিশুদের ডিভাইস কেনার জন্য বরাদ্দের ৯০ হাজার টাকা নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ করেছেন শিক্ষকরা ।
দুর্নীতির এই জাল শুধু মাঠের খেলাধুলাতেই সীমাবদ্ধ নয়, ছড়িয়ে পড়েছে জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের স্পর্শকাতর দায়িত্বেও। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৪২টি ভোটকেন্দ্রের সংস্কারের জন্য প্রতিটিতে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা করে বরাদ্দ দেয়া হয়। সরকার প্রদত্ত বরাদ্দ থেকে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে নামমাত্র টাকা দিয়ে বাকি অর্থ তিনি পকেটস্থ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। মিয়াজানপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. নাছির উদ্দিনসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষকও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে নির্বাচনী কেন্দ্র সংস্কারের বরাদ্দ থেকে টাকা দেয়ার অভিযোগ করেছেন। সবচেয়ে অমানবিক অনিয়মটি ঘটেছে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের ক্ষেত্রে। প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের ডিভাইস ক্রয়ের জন্য আসা সরকারি অনুদান এবং জরুরি দুর্যোগকালীন পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য বরাদ্দকৃত এডুকেশন ইন ইমার্জেন্সি এর তহবিলের ব্যবহার নিয়েও স্বচ্ছতার চরম অভাব লক্ষ্য করা গেছে। শিক্ষকরা অভিযোগ করেছেন, বরাদ্দের ৯০ হাজার টাকা ডিভাইস বিতরণ না করে ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলন করে নেয়া হয়েছে।
এছাড়া উপজেলার বিদ্যালয়গুলোর ভৌত অবকাঠামো ও শিক্ষার পরিবেশ উন্নয়নের জন্য প্রতি বছর আসা ক্ষুদ্র মেরামত ও প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণীর আধুনিকায়নের জন্য বরাদ্দের টাকা ছাড় করতে প্রতিটি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের মোটা অঙ্কের কমিশন দিতে বাধ্য করেন এই শিক্ষা কর্মকর্তা। কমিশন না দিলে বা অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বললে শিক্ষকদের সার্ভিস বুক, উচ্চতর স্কেল, কিংবা পেনশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ফাইল আটকে রেখে মাসের পর মাস ঘোরানো ও হয়রানি করা চরফ্যাশন উপজেলা শিক্ষা অফিসের নিত্যদিনের চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। হাজিরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মনির হোসেন অভিযোগ করেন, এরিয়ার বিলের জন্য উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা তার কাছ থেকে ১৫ হাজার টাকা নিয়েছেন। পরে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকার বিল দেখে অফিস সহকারি ‘সাত্তারের’ কথা বলে আরও ৪০ হাজার টাকা দাবি করা হয়। টাকা না দেয়ায় বিলে স্বাক্ষর করা হয়নি বলে দাবি করেন তিনি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চরফ্যাশনের ১২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতিটিতে এডুকেশন ইন ইমার্জেন্সি খাতে ৩ লাখ টাকা করে বরাদ্দ দেওয়া হয়। পরের অর্থবছরে আরও ৮টি বিদ্যালয়ে ৩ লাখ টাকা করে এবং একটি বিদ্যালয়ে ২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।শিক্ষকদের অভিযোগ, এসব বরাদ্দের বিপরীতে দৃশ্যমান কাজ না করেই অর্থের একটি অংশ ভাগ-বাটোয়ারা করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় বিদ্যালয়কে বাদ দিয়ে পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে বারবার বরাদ্দ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগে ১৮৬ নম্বর দক্ষিণ চর আইচা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের উদাহরণ তুলে ধরে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এডুকেশন ইন ইমার্জেন্সি খাতে ৩ লাখ টাকা এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মেরামত ও সংস্কার খাতে ২ লাখ টাকা পায়। একই অর্থবছরে আবার এডুকেশন ইন ইমার্জেন্সি খাতে ২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।পূর্ব নুরাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও ক্ষুদ্র মেরামত খাতে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং এডুকেশন ইন ইমার্জেন্সি খাতে ৩ লাখ টাকা বরাদ্দ পেয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
মধ্য উত্তর মাদ্রাজ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল হাই খান ওআসলামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দেলোয়ার হোসেনও বলেন, আন্তঃস্কুল ফুটবল টুর্নামেন্টে ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ের অধিকাংশ বরাদ্দ সহ প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের তালিকা নেওয়া হলেও তারা কোনো ডিভাইস পাননি। এদিকে কয়েকজন শিক্ষক জানান, প্রাক-প্রাথমিকের জন্য বিদ্যালয়প্রতি বরাদ্দ ৭ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা করে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। কোনো কোনো বিদ্যালয়ে ওয়াই-ফাই সংযোগ না থাকা বা ইন্টারনেট সচল না থাকার পরও সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের প্রত্যয়ন ছাড়াই একটি কোম্পানির সঙ্গে যোগসাজশে ১৮ লাখ ১৫ হাজার ২০০ টাকা উত্তোলনের অভিযোগও করা হয়েছে। বিদ্যালয়ের কনটিনজেন্সি, বই পরিবহন, টিএ, বিভিন্ন দিবস পালন এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৯৬ শিক্ষকের বিনোদন ভাতার বিল ছাড়ের ক্ষেত্রেও টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
এই বিষয় চরফ্যাশন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো মিজানুর রহমানের নিকট জানতে চাইলে সে জানায়, তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ ভিত্তিহীন। অভিযোগগুলোর বিপক্ষে তার কাছে যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে। তিনি অভিযোগগুলো অস্বীকার করে প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপনের কথাও জানান।শিক্ষকদের অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত এবং সরকারি বরাদ্দের অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহারের বিষয়টি যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।