
মানবপাচারের ট্রানজিট রুট হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহারের অভিযোগ থাকা কক্সবাজারের টেকনাফে এখন একই অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে উঠছে অপহরণ, মুক্তিপণ আদায় ও ডাকাতির অভিযোগ। পাহাড় ও সমুদ্রঘেরা দুর্গম ভূপ্রকৃতিকে কাজে লাগিয়ে অপরাধীরা মানবপাচারের পাশাপাশি মানুষ অপহরণ করে পাহাড়ে আটকে রেখে মুক্তিপণ আদায় করছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা বাড়লেও পাহাড়ের দুর্গম এলাকায় অপরাধীদের তৎপরতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি বলে দাবি তাদের।
স্থানীয়দের ভাষ্য, একসময় টেকনাফের পাহাড় ও উপকূলের বিভিন্ন রুট মানবপাচারের জন্য ব্যবহার করা হতো। এখন পাচারের পাশাপাশি এসব দুর্গম এলাকা অপহৃতদের লুকিয়ে রাখার নিরাপদ স্থান হিসেবেও ব্যবহার করছে অপরাধীরা। অপহরণের পর ভুক্তভোগীদের পাহাড়ের ভেতরে নিয়ে আটকে রেখে পরিবারের কাছে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ দাবি করা হচ্ছে।
পাহাড় ও সমুদ্রের এই ভৌগোলিক সুবিধা কাজে লাগিয়ে অপরাধীরা দ্রুত এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় সরে যেতে পারে। ফলে অভিযান চালিয়েও তাদের অনেককে গ্রেপ্তার করা কঠিন হয়ে পড়ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
অপহরণের পর পাহাড়ে আস্তানা
টেকনাফের বাহারছড়া, নোয়াখালীপাড়া, জুম্মাপাড়া, শীলখালী, কচ্ছপিয়া, জাহাজপুরা, দমদমিয়া, জাদিমুড়া, লেদা, আলীখালী, রঙ্গিখালী, উনচিপ্রাং ও আশপাশের পাহাড়ি এলাকায় সন্ধ্যার পর মানুষের চলাচল কমে যায়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব পাহাড়ি এলাকায় অপরাধীদের কয়েকটি আস্তানা রয়েছে। অস্ত্রের মুখে বাড়ি কিংবা রাস্তা থেকে মানুষ তুলে নেওয়ার পর তাদের পাহাড়ে নিয়ে আটকে রাখা হয়। পরে পরিবারের সদস্যদের ফোন করে মুক্তিপণ দাবি করা হয়।
বাহারছড়ার এক ভুক্তভোগীর অভিযোগ, তাকে রাতে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে প্রথমে পাহাড়ের পাদদেশে রাখা হয়। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা টের পেয়ে আরও দুর্গম পাহাড়ে নিয়ে যায় অপহরণকারীরা। পরিবারের কাছে প্রথমে ৩ লাখ এবং পরে ৪ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। টাকা দেওয়ার পর তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন বছরে টেকনাফের বিভিন্ন এলাকা থেকে অন্তত ৩২০ জন অপহরণের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে গত এক বছরেই অপহৃত হয়েছেন ১৫৫ জন। তাদের ৯৬ জন রোহিঙ্গা নাগরিক।
মানবপাচারের রুটেই বাড়ছে অপহরণ
স্থানীয় বাসিন্দা ও জনপ্রতিনিধিদের দাবি, বাহারছড়ার দীর্ঘ উপকূল ও পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি মানবপাচারের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। কচ্ছপিয়া, নোয়াখালীপাড়া ও আশপাশের কয়েকটি এলাকা পাচারকারীরা ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রথমে পাহাড়ি এলাকায় লোকজনকে লুকিয়ে রাখা হয়। পরে সুযোগ বুঝে তাদের সাগরের দিকে নিয়ে গিয়ে ট্রলারে তোলার চেষ্টা করা হয়। এই একই পাহাড়ি ও উপকূলীয় রুট ব্যবহার করে এখন অপহরণকারীরাও তাদের কার্যক্রম চালাচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
তাদের মতে, মানবপাচারের সুযোগ কমে গেলে সংশ্লিষ্ট অপরাধী চক্রের কেউ কেউ অপহরণ ও ডাকাতির দিকে ঝুঁকে পড়ে। ফলে মানবপাচার বন্ধের সঙ্গে সঙ্গে পাহাড়ি এলাকায় অপহরণ ও ডাকাতি প্রতিরোধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
ক্যাম্প ও পাহাড় ঘিরে অপরাধের অভিযোগ
টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও তৎসংলগ্ন পাহাড়ি এলাকায় বিভিন্ন অপরাধী চক্রের তৎপরতার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, কিছু স্থানীয় ও রোহিঙ্গা অপরাধীর যোগসাজশে অপহরণ, ডাকাতি, মাদক ও মানবপাচারের মতো অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে।
তবে এসব অভিযোগের সঙ্গে কারা জড়িত, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার বিষয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিভিন্ন সময়ে ক্যাম্প ও আশপাশের পাহাড়ি এলাকায় অভিযান চালিয়েছে।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পের কয়েকজন মাঝির দাবি, কথিত অপরাধী চক্রের কিছু সদস্য ক্যাম্পের বাইরে অবস্থান করে পাহাড়ি এলাকায় আশ্রয় নিয়ে অপহরণ, মানবপাচার ও মাদকপাচারে জড়িত।
নিরাপত্তাহীনতায় জনজীবন
অপহরণের আতঙ্কে পাহাড়সংলগ্ন এলাকার মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। স্থানীয়দের কেউ কেউ জানিয়েছেন, সন্ধ্যার পর প্রয়োজন ছাড়া তারা ঘর থেকে বের হন না। কয়েকটি পরিবার নিরাপত্তাহীনতার কারণে বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
পাহাড়ের দিক থেকে মাঝেমধ্যে গুলির শব্দ শোনা যায় বলেও জানিয়েছেন কয়েকজন বাসিন্দা। এতে রাতের বেলায় মানুষের মধ্যে আতঙ্ক আরও বেড়েছে।
স্থায়ী নিরাপত্তার দাবি
স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের দাবি, দুর্গম পাহাড়ি এলাকাগুলোতে স্থায়ী পুলিশ চৌকি স্থাপন এবং নিয়মিত টহল বাড়ানো হোক। গত ৪ জুলাই টেকনাফে অনুষ্ঠিত বিশেষ আইনশৃঙ্খলা সভায় অপহরণপ্রবণ এলাকায় পুলিশ চৌকি স্থাপন, যৌথ অভিযান এবং পাহাড়ে নজরদারি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
কক্সবাজার জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) মো. অহিদুর রহমান বলেন, মানবপাচারসংক্রান্ত মামলাগুলোর তদন্ত চলছে। আসামিদের গ্রেপ্তার ও আইনগত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। টেকনাফে পুলিশের উপস্থিতি বাড়াতে নতুন পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের প্রস্তাবও পাঠানো হয়েছে।
‘অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হবে’
টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, অপহরণের ঘটনাগুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। পাহাড়ি এলাকায় পুলিশি অভিযান ও গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। অপহরণ ও মানবপাচারের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।
তিনি বলেন, কোনো এলাকায় অপহরণের তথ্য পাওয়া গেলে পুলিশ দ্রুত ব্যবস্থা নিচ্ছে। অপরাধীদের বিষয়ে স্থানীয়দের কাছ থেকে তথ্য পাওয়া গেলে তাদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা সহজ হবে।
মানবপাচার বন্ধ হলেই কমবে অপহরণ-ডাকাতি?
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সংস্থার অভিযান চললেও দুর্গম পাহাড় ও বিস্তৃত উপকূলের কারণে টেকনাফে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয়দের মতে, মানবপাচারের রুটগুলো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে একই রুট ব্যবহার করে অপহরণ ও ডাকাতির তৎপরতাও বন্ধ করা কঠিন হবে।
নিরাপদ সীমান্ত আন্দোলনের প্রতিনিধি রুবায়েত হোসাইন বলেন, মানবপাচার, অপহরণ ও ডাকাতি—এই তিনটি অপরাধকে আলাদা করে দেখলে হবে না। পাহাড় ও উপকূলের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে সমন্বিত নজরদারি ও স্থায়ী নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, মানবপাচারের ট্রানজিট রুটগুলো চিহ্নিত করে কঠোর নজরদারি, পাহাড়ে নিয়মিত যৌথ অভিযান, উপকূলে টহল এবং দুর্গম এলাকায় স্থায়ী পুলিশি উপস্থিতি নিশ্চিত করা হবে। তাদের মতে, মানবপাচারের পথ বন্ধ করা গেলে সেই পথ ধরে গড়ে ওঠা অপহরণ ও ডাকাতির তৎপরতাও অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।