
চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদী থেকেছ অপহরণের শিকার মোহাম্মদ নজরুল ইসলামকে উদ্ধার করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিরপুর ক্রাইম ডিভিশনের আওতাধীন পল্লবী থানা পুলিশ সদস্যরা। বস্তায় ভরে অপহরণের সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়ার পর কাজ শুরুকরে মিরপুর বিভাগের পুলিশ। এ ঘটনায় কথিত অপহরণ সাজানো নাটকের সহযোগী হাসান তারেক ওরফে রিপন (২৬)-কে ঢাকায় অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
মিরপুর বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. মোস্তাক সরকার সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) সন্ধায় সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, কর্ণফুলী নদীর মাঝখানে ‘সি হার্ট-২’ নামের একটি ফিশিং জাহাজে সকাল ৮টার দিকে অভিযান চালিয়ে নজরুল ইসলামকে উদ্ধার করেন। পরে তাকে ঢাকায় ফিরিয়ে আনা হয়। নজরুল ইসলাম টাঙ্গাইলের মধুপুর থানার বেকার কোনা গ্রামের মো. শুকুর আলীর ছেলে। তিনি প্রায় ১৭ বছর ধরে পল্লবীর এভিনিউ-২ এলাকায় অবস্থিত দি স্যালভেশন আর্মি যক্ষা ও কুন্ঠ ক্লিনিকে নিরাপত্তা প্রহরী হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। তার মাসিক বেতন প্রায় ১৭ হাজার টাকা। পাশাপাশি মেসে থাকা ব্যক্তিদের জন্য রান্নার কাজও করতেন বলে জানান তিনি। ঘটনার কয়েক দিন আগে পারিবারিক বিষয় নিয়ে প্রথম স্ত্রী রোকেয়া বেগমের সঙ্গে তার কথা কাটাকাটি হয়। এরপর তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন এবং একপর্যায়ে আত্মহত্যার চিন্তা করেন বলে প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে। পরে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে পরিবার ও আর্থিক সংকট থেকে দূরে থাকার জন্য আত্মগোপনের পরিকল্পনা করেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
প্রাথমিক অনুসন্ধানে নজরুল ইসলামের প্রায় ৬ থেকে ৭ লাখ টাকা ঋণ রয়েছে বলে জানতে পেরেছে পুলিশ। ব্যুরো বাংলাদেশসহ বিভিন্ন উৎস থেকে নেওয়া ঋণের পাশাপাশি সুদে নেওয়া ঋণও রয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে। এ ছাড়া নজরুলের ছেলে মো. রিফাত (২৬) পুলিশকে জানিয়েছেন, কিছুদিন আগে তার বাবা একটি ব্যাংক থেকেও প্রায় ৩ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন।দুই পরিবারের ভরণপোষণ, সন্তানের বিয়ে এবং ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ মিলিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই তিনি আর্থিক ও পারিবারিক সংকটে ছিলেন বলে প্রাথমিক তদন্তে প্রতীয়মান হয়েছে। তার দুই স্ত্রী ও দুই ঘরে এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। উভয় পরিবার টাঙ্গাইলে বসবাস করে মাসিক ১৭ হাজার টাকা বেতন থেকে নজরুল দুই পরিবারকে প্রায় ৩ হাজার টাকা করে মোট ৬ হাজার টাকা দিতেন। বাকি অর্থের একটি বড় অংশ ঋণের কিস্তি পরিশোধে ব্যয় হতো। পারিবারিক ও আর্থিক সংকটের কারণে নজরুল ইসলাম মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন।
পুলিশের দেয়া তথ্যমতে, গত ১০ সেপ্টেম্বর রাত ১০টার দিকে নজরুল ইসলাম নাইট গার্ডের দায়িত্বে যোগ দেন। পরদিন কর্মস্থলে তাকে না পাওয়ায় কর্তৃপক্ষ সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে এবং বিষয়টি পুলিশকে জানায়। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ১১ সেপ্টেম্বর ভোর আনুমানিক ৪টা ৪৭ মিনিটে অজ্ঞাতপরিচয় এক ব্যক্তি সাদা প্লাস্টিকের বস্তায় করে নজরুল ইসলামকে ক্লিনিকের প্রধান ফটকের সামনে নিয়ে আসেন। প্রায় এক ঘণ্টা পর ভোর ৫টা ৪৫ মিনিটে নজরুল নিজেই বস্তা থেকে বের হয়ে গেটের সামনে বসেন। পরে ওই ব্যক্তির সঙ্গে রিকশাযোগে সেখান থেকে চলে যান। ফুটেজে এ সময় দৃশ্যমান কোনো জোরজবরদস্তির চিত্র পাওয়া যায়নি। বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হওয়ায় তদন্ত শুরু করে পল্লবী থানা পুলিশ।
মিরপুর বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. মোস্তাক সরকারের তথ্য অনুযায়ী, পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নজরুল তার মেসে থাকা চাচাতো ভাইয়ের ছেলে মো. রিপনের সহযোগিতা নেন। ১১ সেপ্টেম্বর ভোরে রিপন সাদা বস্তায় নজরুলের কাপড়চোপড়ের ব্যাগ নিয়ে গার্ডরুমে প্রবেশ করেন। এরপর নজরুল নিজেই ওই বস্তার ভেতরে ঢোকেন। পরে রিপন তাকে বস্তাসহ ক্লিনিকের প্রধান ফটকের কাছে নিয়ে যান। সেখান থেকে তারা অটোরিকশায় গাবতলী বাসস্ট্যান্ডে যান। গাবতলী থেকে নজরুল শ্যামলী পরিবহনের বাসে চট্টগ্রামের একে খান এলাকায় পৌঁছান। সেখানে ‘রাসেল’ নামের এক পরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করে কর্ণফুলী থানাধীন ইছানগর এলাকায় তার বাসায় অবস্থান করেন। পরে ১৩ সেপ্টেম্বর বিকেলে রাসেল তাকে ‘সি হার্ট-২’ নামের একটি ফিশিং জাহাজে বাবুর্চির কাজের ব্যবস্থা করে দেন। পরদিন অভিযান চালিয়ে পুলিশ ওই জাহাজ থেকে নজরুল ইসলামকে উদ্ধার করে।
মিরপুর বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. মোস্তাক সরকার বলেন, সিসিটিভি ফুটেজ, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নজরুল ইসলামের ঘটনাটি প্রকৃত অপহরণ নয়; বরং পূর্বপরিকল্পিত আত্মগোপন ও কথিত অপহরণের সাজানো নাটক বলে প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হয়েছে। এ ঘটনায় সহযোগী হাসান তারেক ওরফে রিপনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে ঘটনার সঙ্গে অন্য কারও সম্পৃক্ততা, অতিরিক্ত কোনো উদ্দেশ্য বা অন্য কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিল কি না, তা তিয়ে দেখতে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে বলে জানানো হয় সংবাদ সম্মেলন থেকে।