
দেড় মিনিটে ৩৫ বার ‘স্যার’ সম্বোধন করে ভাইরাল হওয়া সেই ইউএনওকে ঘিরে এবার নতুন বিতর্ক। কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তানজিলা তাসনিমের ছুটির আবেদন, কর্মস্থল ত্যাগের সময় এবং তাঁর অনুপস্থিতিতে প্রশাসনিক সেবা সচল রাখার ব্যবস্থা নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন। জেলা প্রশাসক বরাবর দেওয়া ছুটির আবেদনপত্রে অনুমোদনের দৃশ্যমান সিল-স্বাক্ষর নেই। অন্যদিকে, কার্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তার দাবি, ২২ অক্টোবরই ছুটি নিয়ে কর্মস্থল ছেড়েছেন ইউএনও। এদিকে প্রয়োজনীয় কাজে কার্যালয়ে এসে তাঁকে না পেয়ে ফিরে যাওয়ার অভিযোগ করেছেন সেবাপ্রত্যাশীরা।
গত সোমবার (২৬ অক্টোবর) ও মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) রাজারহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে প্রয়োজনীয় কাজে এসে তাঁকে না পেয়ে ফিরে যান কয়েকজন সেবাপ্রত্যাশী। তাঁদের অভিযোগ, বিভিন্ন আবেদন নিষ্পত্তি ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রে স্বাক্ষরের জন্য এসে কর্মকর্তাকে না পেয়ে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। উপজেলায় সহকারী কমিশনার (ভূমি) পদ শূন্য থাকায় এ ভোগান্তি আরও বেড়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
জেলা প্রশাসক বরাবর দেওয়া ছুটির আবেদনপত্রে পারিবারিক কারণ দেখিয়ে ২৫ থেকে ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত চার দিনের নৈমিত্তিক ছুটি চেয়েছেন ইউএনও তানজিলা তাসনিম। একই আবেদনে ২৩ ও ২৪ অক্টোবর সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও কর্মস্থল ত্যাগের অনুমতি চাওয়া হয়েছে।
তবে আবেদনপত্রে ছুটি মঞ্জুরের কোনো দৃশ্যমান সিল বা স্বাক্ষর নেই। ফলে ছুটি যথাযথভাবে অনুমোদিত হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অবশ্য দৃশ্যমান সিল-স্বাক্ষর না থাকাই ছুটি অনুমোদিত হয়নি—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। বিষয়টি নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট দাপ্তরিক নথি যাচাই প্রয়োজন।
অন্যদিকে, ইউএনও কার্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা জাকারিয়া হোসেনের ভাষ্য, ২২ অক্টোবর ছুটি নিয়ে কর্মস্থল ত্যাগ করেছেন ইউএনও। তিনি বলেন, ‘ইউএনও স্যার ২২ তারিখ ছুটি নিয়ে গেছেন। বৃহস্পতিবার আসার কথা।’
আবেদনপত্রে ছুটির শুরুর তারিখ ২৫ অক্টোবর উল্লেখ থাকলেও প্রশাসনিক কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, ইউএনও কর্মস্থল ছেড়েছেন ২২ অক্টোবর। ফলে আগাম কর্মস্থল ত্যাগের অনুমতি ছিল কি না, ছুটি কবে অনুমোদিত হয়েছে এবং কোন তারিখ থেকে কার্যকর হয়েছে—এসব বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
প্রয়োজনীয় কাজে ইউএনও কার্যালয়ে এসে ফিরে যেতে হয়েছে স্থানীয় বাসিন্দা মো. হানিফ আলীকে। তিনি বলেন, ‘ইউএনও অফিসে এসেছি, একটা আবেদনপত্রে স্যারের স্বাক্ষর লাগবে। উনি নাকি ছুটিতে আছেন। এ জন্য আমার কাজটা হলো না।’
আরেক বাসিন্দা মো. রাশেদুল ইসলাম বলেন, ‘ইউএনও নেই। কত মানুষকে আসতে দেখলাম, আবার কাজ না পেয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে।’
স্থানীয়দের অভিযোগ, গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কাজে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার স্বাক্ষর ও সিদ্ধান্ত প্রয়োজন হলেও তাঁকে না পাওয়ায় বিভিন্ন কাজ আটকে যাচ্ছে। তবে কতটি আবেদন নিষ্পত্তি হয়নি, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি।
ইউএনওর অনুপস্থিতিতে রাজারহাট উপজেলার রুটিন দায়িত্ব পালনের কথা কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার ইউএনও মো. মাহমুদুল হাসানের। তিনি জানান, জেলা প্রশাসক তাঁকে মৌখিকভাবে দায়িত্ব পালনের বিষয়টি জানিয়েছেন। তবে তাঁর হাতে লিখিত দায়িত্ব অর্পণের কোনো আদেশ নেই।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবেও তাঁকে নিয়মিত রাজারহাটে পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে বিকল্প দায়িত্ব পালনের ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এদিকে কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ ২২ অক্টোবর থেকে ছুটিতে থাকায় অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক আসাদুজ্জামান দায়িত্ব পালন করছেন।
আসাদুজ্জামান বলেন, ‘ডিসি স্যারও ছুটিতে রয়েছেন। আমি বর্তমানে ছুটিকালীন দায়িত্ব পালন করছি। রাজারহাট উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা অনুপস্থিত থাকার বিষয়ে আমাকে কোনো লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়নি।’
তবে বিষয়টি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দেন তিনি।
গত ২২ অক্টোবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও ঘিরে আলোচনায় আসেন ইউএনও তানজিলা তাসনিম। ভিডিওতে প্রায় দেড় মিনিটে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলুকে ৩৫ বার ‘স্যার’ সম্বোধনের বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়।
সেই আলোচনা চলার মধ্যেই এবার তাঁর ছুটির আবেদন, কর্মস্থল ত্যাগের সময় এবং অনুপস্থিতিতে প্রশাসনিক সেবা ব্যাহত হওয়ার অভিযোগ সামনে এল।
এর আগে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে কক্সবাজার সদর উপজেলার ইউএনও থাকাকালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা পরিচয়ে এক পর্যটককে গ্রেপ্তারের হুমকি দেওয়ার অভিযোগের ঘটনাতেও তাঁকে নিয়ে আলোচনা হয়েছিল।
সর্বশেষ অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে ইউএনও তানজিলা তাসনিম ও জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ছুটির আবেদন যথাযথভাবে অনুমোদিত হয়েছিল কি না, নির্ধারিত সময়ের আগে কর্মস্থল ত্যাগের অনুমতি ছিল কি না এবং তাঁর অনুপস্থিতিতে নাগরিক সেবা সচল রাখার কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না—এসব প্রশ্নের স্পষ্ট ব্যাখ্যা চান স্থানীয় সেবাপ্রত্যাশীরা।
তাঁদের দাবি, অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক। পাশাপাশি বিকল্প দায়িত্ব পালনের কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হোক, যাতে কোনো কর্মকর্তার অনুপস্থিতিতে সাধারণ মানুষকে সরকারি সেবা থেকে বঞ্চিত হতে না হয়।