
ভারতের রাজধানী দিল্লিতে অবস্থিত প্রায় দেড়শ বছরের পুরোনো রেসকোর্স মসজিদে নামাজ পড়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল রেখেছে দিল্লি হাইকোর্ট।
প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সন্নিকটে অবস্থিত জয়পুর পোলো গ্রাউন্ড ও রেসকোর্স ক্লাবের পাশে এই শাহী মসজিদটির অবস্থান। প্রশাসন এলাকাটিকে নিজেদের দাবি করার পর থেকেই মসজিদটি ঘিরে আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি সরকার বুলডোজার চালানোর পরিকল্পনা করলে মসজিদের বিদ্যুৎ ও পানি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয় এবং বিপুল পুলিশ মোতায়েন করা হয়, যা এলাকায় তীব্র আতঙ্কের সৃষ্টি করে।
যদিও আদালত বর্তমানে মসজিদটিতে বুলডোজার চালানোর পরিকল্পনা সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে, তবে নিরাপত্তার অজুহাতে সেখানে নামাজ আদায়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি রেখেছে। মসজিদ কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, উচ্ছেদ অভিযান ইতোমধ্যে সমাপ্ত হয়েছে এবং এলাকায় বর্তমানে কোনো উত্তেজনাকর পরিস্থিতি নেই। কমিটির সদস্যরা আদালতে ছবিসহ প্রমাণ উপস্থাপন করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক বলে দাবি করেন। তবে হাইকোর্ট কোনো ধরনের ‘অপ্রীতিকর ঘটনা’ এড়ানোর যুক্তিতে মুসল্লিদের প্রবেশ ও নামাজ পড়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছে। দীর্ঘ ১৫০ বছরের পুরোনো দিল্লির রেসকোর্স মসজিদে সাময়িকভাবে বুলডোজার চালানো স্থগিত থাকলেও, সেখানে মুসলিমদের নামাজ আদায়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল রেখেছে দিল্লির হাইকোর্ট। কর্তৃপক্ষ জানায়, উচ্ছেদ অভিযান চলার সময় অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে এলাকার একটি মন্দিরের বাইরের লোকজনের পাশাপাশি মসজিদেও বহিরাগতদের প্রবেশ বন্ধ রাখা প্রয়োজন। মসজিদ কমিটির পক্ষ থেকে হাইকোর্টে আবেদন করে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল যে, মসজিদে নামাজ পড়তে বাধা দেওয়া ভারতীয় সংবিধানের ধর্ম পালনের অধিকারের সরাসরি হস্তক্ষেপ।
আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী, আগামী ১৬ ডিসেম্বর এই মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে। একইসাথে সরকারকে মসজিদটির বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে সচিত্র প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। মসজিদ কমিটি তাদের আবেদনে যুক্তি দিয়েছিল যে, ইবাদতে বাধা দেওয়া ধর্মীয় অধিকারের পরিপন্থী। কিন্তু সেই সাংবিধানিক যুক্তির বিপরীতে প্রশাসন নিজেদের নিরাপত্তার যুক্তিটিই আদালতে প্রাধান্য পেয়েছে। এই ঘটনায় ভারতে মুসলমানদের বর্তমান পরিস্থিতি এবং তাদের ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর নগ্ন হস্তক্ষেপের বিষয়টি আবারো নগ্নভাবে সামনে এলো।
ঐতিহাসিক এই মসজিদটি ১৯৭৭ সালে দিল্লি ওয়াকফ বোর্ডের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল এবং ২০০৯ সালে হেরিটেজ বা ঐতিহাসিক স্মারক হিসেবে সরকারি স্বীকৃতি লাভ করে। বর্তমানে মসজিদটি রক্ষায় দিল্লি ওয়াকফ বোর্ড কেন্দ্রীয় ল্যান্ড ও ডেভেলপমেন্ট অফিসের কাছে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরার জন্য চার সপ্তাহের সময় পেয়েছে, যা মসজিদটির টিকে থাকার মেয়াদ সাময়িকভাবে চার মাস বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে স্থানীয়দের মধ্যে ওয়াকফ বোর্ডের ভূমিকা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে, কারণ অনেকের অভিযোগ বোর্ডটিতে এখন বিজেপি সমর্থিতদের আধিপত্য রয়েছে। এদিকে, বর্তমান পরিস্থিতিতে দিল্লি ওয়াকফ বোর্ডের ওপরও আস্থা রাখতে পারছেন না স্থানীয়রা।
তীব্র উত্তেজনার মাঝে স্থানীয় মুসলমানরা চরম ধৈর্য ও সংযমের পরিচয় দিয়ে আইনের আশ্রয় নিলেও আদালতের এই আদেশে তারা হতাশ। দীর্ঘদিন ধরে টিকে থাকা একটি প্রাচীন ধর্মীয় স্থাপনায় এভাবে ইবাদত বন্ধ করে দেওয়াকে অনেকেই ভারতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর প্রশাসনিক বঞ্চনার একটি অংশ হিসেবে দেখছেন।