1. ajkerkagojbd22@gmail.com : Ajker Jagoj : Ajker kagoj
  2. asikkhancoc085021@gmail.com : asikengg :
  3. minniakter1@gmail.com : minni akter : minni akter
অন্যান্য Archives - Page 5 of 5 - আজকের কাগজ
বুধবার, ০৩ জুন ২০২৬, ১১:৪০ অপরাহ্ন
অন্যান্য

হাইব্রিডদের চাপে ত্যাগীরা কোণঠাসা !

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধির তাগিদ দিচ্ছে যখন বিএনপি আর সেই সুজোগে রাজনীতির মাঠে এখন হাইব্রিড নেতারা স্বর্গম ! দলের ভেতরে হাইব্রিড অনুপ্রবেশের কারণে পাল্টে যাচ্ছে বিএনপির তৃণমূলদের মাঠের চিত্র।

আরো পড়ুন

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্রিফিংয়ের গাল গল্প লেখা সাংবাদিকতা নয়:জাফর ইকবাল

পৃথিবীব্যাপী উন্নত দেশসমূহে কোন অপরাধ সংগঠিত হলে সেসব দেশের আইনশৃঙ্খলাবাহিনী ঘটনার চুল ছেঁড়া বিশ্লেষণ করে। প্রতিটি পসিবল উপকরণ ক্ষতিয়ে দেখে। উন্নত সব প্রযুক্তির ব্যবহার করে। এরপর তারা অপরাধী সনাক্ত করেন।

আরো পড়ুন

বিয়েতে কেন প্রয়োজন সমতা বিধান

বিয়ে একটি সামাজিক বন্ধন বা বৈধ চুক্তি, যার মাধ্যমে দুজন মানুষের মধ্যে দাম্পত্য সম্পর্ক স্থাপিত হয়। আল্লাহর রাসুল (সা.) বিয়েকে দেহ ও মনের প্রশান্তি অর্জনের উপায় বললেও বিয়ের পর দাম্পত্য

আরো পড়ুন

কৃষি উন্নয়নে নতুন কৌশল ও প্রতারণাহীন বাজার ব্যবস্থা

বছরের কোনো কোনো সময়ে পত্রপত্রিকায় ‘বাজারে আগুন লেগেছে’, ‘নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী’, ‘সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস’ জাতীয় শিরোনাম দেখা যায়। প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মধ্যে চাল, ডাল, পেঁয়াজ, তেল, সবজির দাম সাধারণ মানুষকে বেশি প্রভাবিত করে। তবে সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় বাজারে চালের দাম বাড়লে। বাংলাদেশ চাল উৎপাদনে বিশ্বে চতুর্থ, যা বিশ্বের মোট উৎপাদনের ৭ শতাংশ। দেশের জনগণের দৈনিক ক্যালরির ৭০ শতাংশের বেশি আসে এই চাল থেকে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার হিসাবে বাংলাদেশ মাথাপিছু বার্ষিক চাল ভোগে এশিয়ায় দ্বিতীয়, যা প্রায় ১৮০ কেজি। স্বাধীনতার পর  থেকে বাংলাদেশ কৃষি ক্ষেত্রে, বিশেষ করে চাল উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। বিশেষ করে চাল উৎপাদন তিন গুণের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। একইভাবে সবজি, মাছ, মাংস, দুধ, ডিম, ভুট্টা উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে চাষযোগ্য জমি ২৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। তবে এখনো মোট চাষযোগ্য জমির ৭৭ শতাংশ ধান উৎপাদনে ব্যবহার হচ্ছে। ধান উৎপাদন কৃষি জিডিপির ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ, মোট গ্রামীণ কর্মসংস্থানের ৫০ শতাংশ ও ১৫ শতাংশ গ্রামীণ খানা আয়ে অবদান রাখছে। সুতরাং খাদ্যনিরাপত্তার জন্য চাল বাংলাদেশের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ৬০ শতাংশ লোক প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ধান উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল। চাল শুধু কৃষিপণ্য নয়, রাজনৈতিকভাবে অতিসংবেদনশীল পণ্য। আমাদের দেশে বাজারে চালের দাম বাড়লে পত্রপত্রিকায় বলা হয়, এটা ‘মধ্যস্বত্বভোগীদের সিন্ডিকেট’। তারাই চাল মজুদ করে রাখে এবং মজুদ বৃদ্ধির মাধ্যমে চালের মূল্যবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। তখন সরকারি কর্মকর্তা গুদামে হানা দেন। আবার অনেক সময় দেখা যায় বাজারে কৃষিপণ্যের দাম নির্ধারণ করে দেন। আমাদের বোঝা উচিত অপরিকল্পিত হস্তক্ষেপে এভাবে বাজার ব্যবস্থা চলে না। বাজার তার নিয়মে চলে। সেটি হলো চাহিদা ও জোগানের মধ্যে সমন্বয় হয়েই দাম নির্ধারিত হয়। কাজেই এর বাইরে কাজ করতে গেলে বা বাজারকে বাধা দিতে গেলে হিতে বিপরীত হতে পারে। বাংলাদেশে হচ্ছেও তাই। বাণিজ্যিক দিক দিয়ে বিবেচনা করলে সত্য যে চালের বাজারদর সাধারণত মিল মালিকদের ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশে সরকারি হিসাবে (খাদ্য অধিদপ্তর) চালের মিলের সংখ্যা ১৮ হাজার ৪০৯ (জুন ২০২১)। তার মধ্যে স্বয়ংক্রিয় চাল মিলের সংখ্যা ২ হাজার ৮৪৭, আধা স্বয়ংক্রিয় ২ হাজার ২৩৮টি (রাবার পলিশার ও পলিশিং যুক্ত)। সংখ্যা বিবেচনায় বাংলাদেশের চালের বাজার অনেকটা পাঠ্যপুস্তকে বর্ণিত পূর্ণ প্রতিযোগিতার কাছাকাছি। এর বড় বৈশিষ্ট্য হলো বাজারে অসংখ্য বিক্রেতা ও ক্রেতা এবং মধ্যস্বত্বভোগী। পণ্য চলাচলে ও প্রক্রিয়াকরণে মধ্যস্বত্বভোগীরা বাজারে মূল্যশৃঙ্খলে বড় অবদান রাখে। তাদের মাধ্যমে চাল কৃষক থেকে ভোক্তা পর্যায়ে চলে আসে। বলা যায়, মধ্যস্বত্বভোগীরা যদি অত্যধিক লাভ করত তাহলে বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের পরিমাণ আরো অনেক বেশি বেড়ে যেত। অন্যান্য খাতের লোকজন এ খাতে আরো চলে আসত। ২০১২-১৪ এ সময়ে স্বয়ংক্রিয় ও আধা স্বয়ংক্রিয় মিলের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় না পেরে বরং ছোট ও মাঝারি ১২ হাজারের অধিক সাধারণ মিল বন্ধ হয়ে গেছে। অর্থাৎ চালের বাজারে প্রবেশ ও বের হওয়া উন্মুক্ত (easy entry, easy exit), যা প্রতিযোগিতামূলক বাজার ব্যবস্থার ইঙ্গিত দেয়। বাংলাদেশে মোটাদাগে তিন ধরনের চাল উৎপাদন হয়—আউশ, আমন ও বোরো। আউশ রোপণ করা হয় মার্চ থেকে মে মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত আর কাটা হয় জুলাই-আগস্টের দিকে। আমনের ক্ষেত্রে রোপণ শুরু হয় মে মাসের মাঝামাঝি থেকে আগস্টের মাঝামাঝি পর্যন্ত। আর তা কাটা হয় নভেম্বর থেকে জানুয়ারির মাঝামাঝিতে। বোরোর রোপণ ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থেকে ফেব্রুয়ারি আর ধান তোলা হয় এপ্রিল-মে মাসে। ধান উৎপাদনে কাছাকাছি তিনটি মৌসুম হওয়ায় চাল দীর্ঘকালীন মজুদের সুযোগ কম। ব্যবসায়ীরা এই দীর্ঘকালীন মজুদ করে না। মজুদ আইন সে কারণেই প্রয়োগের সুযোগ কম। ধান তোলার আগে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর এবং ফেব্রুয়ারি-মার্চ বাজারে চালের সরবরাহ কম থাকে এবং এ সময়ে কিছু মূল্যবৃদ্ধি হতে পারে। পরবর্তী সময়ে ধান তোলার পর বাজারে জোগান বেড়ে যাওয়ার ফলে দাম ধীরে ধীরে কমে যায়। তাছাড়া কৃষকদের মধ্যে ৮০ শতাংশ ক্ষুদ্র চাষী (১ হেক্টরের কম জমি)। এদের বেশির ভাগ নিতান্ত টিকে থাকার জন্য ধান উৎপাদন করেন। সেক্ষেত্রে উদ্বৃত্ত থাকে খুব কম। তারা বেশির ভাগ সময় বাজার থেকে চাল ক্রয় করেন, তাছাড়া তাদের জায়গাস্বল্পতায় ধান গুদামজাতের সুযোগও খুব কম। তবে আমাদের দেশের মূল্যবৃদ্ধির ক্ষেত্রে উৎপাদকের স্বার্থকে বড় করে দেখা হয়, ভোক্তাদের কথা পরে আসে। দাম বাড়লে সংখ্যায় কম উদ্বৃত্ত কৃষকের আয় বাড়ে, অন্যদিকে খাদ্যের দাম বাড়লে প্রায় ১৭ কোটি ভোক্তার মধ্যে নিম্ন আয়ের দরিদ্র মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় বেশি। খুব প্রতিযোগিতামূলক হওয়ায় এমনিতে ধান চাষ অন্যান্য কৃষিপণ্যে, যেমন সবজি, ফলের তুলনায় কম লাভজনক। সরকারি হিসাবে ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রতি কেজি বোরো উৎপাদনে খরচ ৩৯ টাকা। অন্যদিকে একই অর্থবছরে প্রতি কুইন্টাল (১০০ কেজি) মোটা চালের খুচরা মূল্য ৪ হাজার ৮১ টাকা, অর্থাৎ প্রতি কেজি প্রায় ৪১ টাকা। ২০২০-২১ অর্থবছরে জনসংখ্যা ১৬৯ মিলিয়ন, এর জন্য নিট খাদ্যশস্য প্রয়োজন ৩১ দশমিক ৩৯ মিলিয়ন টন। আবার এ সময়ে নিট খাদ্যশস্য উৎপাদন ৩৮ মিলিয়ন টন (যার মধ্যে চাল উৎপাদন ৩৪ দশমিক ৮৮ মিলিয়ন টন)। অন্যদিকে ২০১৯-২০ অর্থবছরে খাদ্যশস্য আমদানির পরিমাণ ৬ দশমিক ৪ মিলিয়ন টন, তার মধ্যে চালের পরিমাণ মাত্র ৪ হাজার ৩০০ হাজার টন। অর্থাৎ বোঝা যাচ্ছে যে আমাদের খাদ্য বিশেষ করে চাল উৎপাদনে স্বয়ম্ভরতা অর্জিত হয়েছে। এ তথ্য বলে দেয়, উৎপাদন তথ্য সঠিক হলে চালের দাম বৃদ্ধির ঘটনা হওয়া উচিত সাময়িক এবং তা অনেকাংশে বাজারে চাহিদা ও জোগানের ওপর হবে নির্ভরশীল। বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় কৃষিজ পণ্যের দাম বেড়ে যায়। চালের উদ্বৃত্ত হওয়া সত্ত্বেও উৎপাদন মৌসুমেই দেখা যায় মোটা চালের দাম বাজারে বৃদ্ধি পায়; যা এই ভরা আমন মৌসুমেই ৫৫-৫৬ টাকা, ব্যাপারটা খাদ্য ঘাটতিজনিত নয়, এখানেই অটো মিল মালিক ও সেমি অটো মিল মালিকদের দায়ী করা যায়। তবে সেটা সিন্ডিকেশন করে নয়, বরং মুনাফার জন্য প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে। আমাদের দেশে ‘মিনিকেট’ চিকন চালের ব্যাপক প্রচলন করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে উৎপাদনে এমন কোনো ধান জাত নেই। মিলাররা মোটা চাল কেটে কৃত্রিমভাবে মসৃণ করে, মিনিকেট, চিকন নাজিরশাইল ও বাংলাদেশী বাসমতী নামে বিক্রি করেন। ভোক্তাদের ঠকানো এ প্রক্রিয়ায় মোটা চালগুলো মসৃণ চিকন চাল হয়ে যায়। প্রতি কেজি মোটা ধান ক্রয় করে তা ডায়মন্ড, হরিণ, রশিদ ইত্যাদি ব্র্যান্ডের মিনিকেট ৬৫-৬৭ টাকা কেজিতে বিক্রি করে মুনাফা করেন এবং এভাবে মোটা চালের সরবরাহ কমে ভরা মৌসুমেই মিলাররা দাম বাড়ার পরিস্থিতি তৈরি করেন। আমাদের দেশে চালের দাম ভরা মৌসুমে বেড়ে যাওয়ার এটাই বস্তুনিষ্ঠ ইতিবৃত্ত। এ বাজার প্রতারণা অবশ্যই বন্ধ করতে আইনগত পদক্ষেপ নিতে হবে। আইন করতে হবে। চাল উৎপাদনের জাতভিত্তিকই বস্তাবন্দি হবে এবং জাতের নামেই বাজারে বিক্রি করতে হবে। যেমন বিআর ২৮, বিআর ২৯, বিআর ৭৪, বঙ্গবন্ধু-১০০ জাত ইত্যাদি। এরপর কার্যকর ও লাভজনক কৃষির দিকে যেতে হলে আমাদের সমন্বিত কৌশল গ্রহণ করতে হবে। প্রথমত, কৃষক বা উৎপাদনকারীদের কম খরচে অধিক ফলন লাভের জন্য অধিক মনোযোগী হতে হবে। কৃষি বিজ্ঞানী ও গবেষকদের অবশ্যই জবাব খুঁজতে হবে যে অত্যধিক ভর্তুকি দেয়া সত্ত্বেও কেন বাংলাদেশে প্রতিবেশীদের থেকে চালের একরপ্রতি উৎপাদন খরচ বেশি। অধিক উৎপাদনশীল উন্নত জাত উদ্ভাবনের পাশাপাশি ভালো মানের বীজ ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ সরবরাহ করতে হবে। খরচ কমানোয় কৃষি যান্ত্রিকীকরণের বিকল্প নেই। আমাদের দেশের উপযোগী কৃষি যান্ত্রিকীকরণ উদ্ভাবন এবং তা বাণিজ্যিকীকরণে নজর দিতে হবে। এর সঙ্গে কৃষকদের আধুনিক প্রযুক্তি সুবিধা পৌঁছানোর জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র পরিসরের খামার মেশিন, মেকানিকস সেবা এবং মেশিন মেরামতের ওপর কৃষকদের এবং যন্ত্র ব্যবসায়ীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, যা আগেই বলেছি, আমাদের দেশের বাজার ব্যবস্থা প্রতারণাপূর্ণ। কৃষক পর্যায় থেকে ভোক্তা পর্যায়ে আসতে অনেক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আসতে হয়। এ প্রক্রিয়াগুলোকে সহজতর ও ঝামেলাবিহীন করার জন্য সব পক্ষকে এগিয়ে আসতে হবে। সরকার থেকে গভীর পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে অধিকতর সচেষ্ট থাকতে হবে, যাতে পরিবহন পর্যায়ে অন্যায় চাঁদাবাজিতে চালের খুচরা বিক্রয় দাম বেড়ে না যায়। লবণে আয়োডিন, ভোজ্যতেলে যেভাবে আইন করে ভিটামিন-এ সংযুক্ত করা হচ্ছে, সেভাবেই চাল-আটায় জিংকসহ অন্যান্য মাইক্রো পুষ্টি উপাদান ব্রিডিংয়ের মাধ্যমে আইন করে সংযুক্ত করতে হবে, যা এখানে স্মরণযোগ্য। ভোক্তা পর্যায়ে মূল্যশৃঙ্খলে যাতে ব্যাঘাত না ঘটে, সে ব্যাপারে নিয়মিত তদারক ব্যবস্থা জোরদার করা থেকে বাজার অবকাঠামো শক্তিশালীকরণ, কৃষক পর্যায়ে মজুদ সুবিধা বৃদ্ধির দিকে সরকারকে অধিকতর দৃষ্টি রাখতে হবে। সরকার খাদ্যশস্য উৎপাদনে প্রতি বছর প্রচুর ভর্তুকি দেয়। ২০১৯-২০ অর্থবছরে এই পরিমাণ ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি। নীতি পর্যায়ে সরকার অষ্টম পঞ্চম বার্ষিক পরিকল্পনা অনুযায়ী এখন আগামী পাঁচ বছর নিম্নবর্ণিত কৌশল অবলম্বন করবে, যা উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রতি একর উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে আনবে। ক) ফসলের উৎপাদনশীলতা ও উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে খাদ্যের সহজলভ্যতা, খাদ্যের অধিক ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি করা; খ) প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো উন্নয়ন ও দক্ষ প্রযুক্তি পরিষেবাগুলোর মাধ্যমে কৃষকদের সক্ষমতা ও আয় বৃদ্ধি এবং বাজার ব্যবস্থা শক্তিশালী করা; গ) পুষ্টিকর, নিরাপদ ও চাহিদা রয়েছে এমন খাদ্যের চাহিদা নিশ্চিত করার জন্য খাদ্য উৎপাদন পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নে সহায়তা করা; ঘ) স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সহযোগী সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে কৃষিপণ্য রফতানিতে উৎসাহ দেয়ার জন্য কৃষি গবেষণা আধুনিকায়ন, শিক্ষা, সম্প্রসারণ, উপকরণ ব্যবস্থাপনা ও টেকসই প্রযুক্তি উদ্ভাবনের জন্য কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন দক্ষ জনশক্তির উন্নয়ন; ঙ) কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও কৃষিপণ্যের স্বচ্ছ বিপণন সুবিধা নিশ্চিতকরণ এবং ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণে কৃষকদের সহায়তা প্রদান অব্যাহত রাখা; চ) কৃষি যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে ব্যয় সাশ্রয়ী চাষ পদ্ধতি চালু করা; ছ) ভূমি, পানি এবং অন্যান্য সম্পদের আরো দক্ষ ও সুষম ব্যবহারের মাধ্যমে অবশ্যই টেকসই কৃষি প্রবৃদ্ধি নিশ্চিতকরণ এবং বিদ্যমান সেচ ব্যবস্থা ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমিয়ে এনে সেচকাজে ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহারে উৎসাহ প্রদান; জ) ক্ষুদ্র সেচের জন্য সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল স্থাপনে গ্রামীণ এলাকাগুলোকে অগ্রাধিকার প্রদান; ঝ) কৃষি ক্ষেত্রে ন্যানো-টেকনোলজির প্রবর্তন, বিজ্ঞানভিত্তিক কৃষি প্রযুক্তিকে উৎসাহ প্রদান, খরা, জলাবদ্ধতা, লবণাক্তপ্রবণ এলাকা উপযোগী কৃষি উন্নয়নের জন্য আধুনিক কৃষি পদ্ধতি অনুসরণ, যেখানে পানি ও সময়ের অর্থনৈতিক দিকটি যথাযথভাবে বিবেচনা করা। ফসল বৈচিত্র্যায়নে জোর দেয়া; ঞ) কৃষি ক্ষেত্রে জিনগত পরিবর্তন, প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়া এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি প্রবর্তন ও চর্চা করা, যেখানে খরাপ্রবণ, জলাভূমি, পাহাড় এবং উপকূলীয় অঞ্চলে পরিবেশবান্ধব সবুজ প্রযুক্তি ব্যবহারসহ আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি উৎসাহিত করা এবং দেশের দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ত, জলমগ্নতা ও অন্যান্য ঘাতসহিষ্ণু ফসলের জাতের প্রচলন করা; ট) সেচ ব্যয় কমিয়ে আনতে আন্তঃমন্ত্রণালয়/আন্তঃসংস্থার সমন্বয় এবং সবার অংশগ্রহণে কৌশল প্রণয়ন ও ব-দ্বীপ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে পানিসম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিতকরণ;আমাদের উৎপাদনশীল আধুনিক কৃষির দিকে ধাবিত হতে হবে। মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উচ্চ আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার পথে আমাদের গতানুগতিক কৃষি থেকে বেরিয়ে এসে আরো গতিশীল কৃষির দিকে ধাবিত হতে হবে। তার জন্য চাই কার্যকর ও দক্ষ বাজার ব্যবস্থা। জিডিপির অনুপাতে কৃষির অবদান ধারাবাহিকভাবে কমে যাবে একথা সত্য, তবে খাদ্যনিরাপত্তার জন্য কৃষির গুরুত্ব অদূরভবিষ্যতে হ্রাস পাবে না; বরং বৃদ্ধি পাবে। নেদারল্যান্ডসের মতো ক্ষুদ্র উন্নত দেশ এখনো প্রতি বছর ১২০ বিলিয়ন ডলার কৃষিপণ্য রফতানি করে। বাংলাদেশ ও নেদারল্যান্ডস ব-দ্বীপ দেশ। বাংলাদেশের এ দেশ থেকে অনেক কিছু শেখার আছে। কৃষির জন্য তা বেশি সত্য। সে কারণে আমরা শতবর্ষব্যাপী ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০ গ্রহণ করেছি। এখন তা বাস্তবায়নের মাধ্যমে কৃষি আধুনিকীকরণের দিকে ধাবিত হয়ে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা অর্জনে এগিয়ে যেতে হবে। ড. শামসুল আলম: প্রতিমন্ত্রী, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়

আরো পড়ুন

‘মধ্যম আয়ের’ স্বপ্নকে গণতন্ত্রায়ণের চ্যালেঞ্জ

৫০ বছর আগে নাগরিক ও পর্যবেক্ষক উভয়েরই উদ্বেগের প্রধান বিষয় ছিল সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ। পাঁচ দশকের মাথায় একটি দারিদ্র্যপীড়িত দুর্যোগপ্রবণ, দুর্বল অর্থনীতির দেশ টেকসই অর্থনৈতিক রূপান্তরের অসাধারণ একটি প্রতিপাদ্য সব মহলের সামনে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছে। এ অর্জন রাতারাতি হয়নি, হঠাৎ করেও নয়। কিন্তু পরিবর্তনের গাথা অনস্বীকার্য ও গভীর। তাই পরবর্তী ৫০ বছরের দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশ শক্তির জায়গা থেকেই মধ্যম আয় তথা আরো উন্নত অর্থনৈতিক স্তরে পৌঁছার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করছে। কিন্তু অর্থনৈতিক উন্নয়নের চিত্র যতটা পরিষ্কার, রাজনৈতিক উন্নয়নের মাপকাঠিতে চিত্রটি ভিন্ন ও আশাব্যঞ্জক নয়। অথচ স্বাধীনতার পরপর রাজনীতিকেই কম চ্যালেঞ্জের মনে হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে রাজনৈতিক উন্নয়নের যেই ঘাটতি অনুভূত হচ্ছে, তা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, মানবিক সমাজের স্বপ্ন নষ্ট করে দিচ্ছে। প্রতিনিধিত্বমূলক অধিকারগুলো মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে, যেমন হয়েছে সব জবাবদিহিতার প্রতিষ্ঠানগুলোও। এ ধরনের রাজনৈতিক অবক্ষয় জবাবদিহিহীন ক্ষমতা, ব্যাপক স্বজনপ্রীতি কাঠামোগত দুর্নীতিতে ইন্ধন জোগাচ্ছে। তবে বর্তমানের এ বৈপরীত্যে ভরপুর চ্যালেঞ্জের আলোচনায় আসার আগে পেছনটা ভালো করে দেখা যাক। পাঁচ দশকে বাংলাদেশের উঠে আসার গল্প নানাভাবে, নানা সূচকে বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু প্রচলিত সূচকের পরিসংখ্যানগত আলোচনা আসলে বাংলাদেশের রূপান্তরের ব্যাপ্তি ও গভীরতাকে সুবিচার করে না। পাঁচটি কাঠামোগত রূপান্তর এখানে বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। প্রথম গভীর ও কাঠামোগত রূপান্তর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায়। দুর্যোগের শিকার—এ প্রতিষ্ঠিত ভাবমূর্তির কালো ছায়া থেকে বেরিয়ে এসে বিশ্বদরবারে সব দুর্যোগের ব্যবস্থাপক হিসেবে সর্বজন মহলে স্বীকৃতি পাওয়া সত্যি এক বিরল অর্জন। দ্বিতীয় রূপান্তর খাদ্যনিরাপত্তায়। জনসংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। আবাদযোগ্য জমি কমেছে বৈ বাড়েনি। এ বাস্তবতায়ও খাদ্য উৎপাদন তিনগুণের বেশি বেড়েছে। নিরক্ষর কৃষক প্রযুক্তির সুযোগ খোলামনে ও মহোৎসাহে গ্রহণ করেছেন। কৃষি বিজ্ঞানীরা নতুন নতুন ধানের ভ্যারাইটি ও অন্যান্য শস্য উদ্ভাবনের ধারাবাহিক কাজ করে গেছেন। আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের কাঠামো ভেঙে বাজার ব্যবস্থা সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। খাদ্যনিরাপত্তা অর্জনের এই ধারাবাহিকতায় তাই প্রবৃদ্ধির অন্বেষণে কোনো সময় বড় কোনো হোঁচট খেতে হয়নি। তৃতীয় রূপান্তরমূলক কৃতিত্ব হলো অবকাঠামোগত প্রান্তিকতার অভিশাপ দূর করা এবং বিচ্ছিন্ন গ্রামের সমন্বয়ে গঠিত গ্রামপ্রধান একটি দেশকে বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে একীভূত একটি সংযুক্ত জাতীয় অর্থনীতিতে রূপান্তর করা, যেখানে উদ্যোক্তা ও শ্রমিক উভয়ই ‘বিদেশকে’ একটি অন্যতম অর্থনৈতিক গন্তব্যে রূপান্তর করেছে। চতুর্থ রূপান্তরমূলক অর্জন নারীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক উত্থান, যদিও আরো গভীর ক্ষমতায়নের লড়াইটা এখনো বাকি রয়ে গেছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণ, জন্মনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার, ক্ষুদ্রঋণে প্রবেশাধিকার এবং নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এ ধরনের রূপান্তরকে সম্ভব করেছে। জন্মহার হ্রাসও একটি রূপান্তরমূলক অর্জন। আমার নিজস্ব গবেষণায় দেখা যাচ্ছে যে ১৯৮০ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির এক-তৃতীয়াংশ জন্মহার হ্রাসের কারণে। প্রবৃদ্ধির প্রচলিত অর্থনৈতিক বয়ান বা রাজনৈতিক গোষ্ঠীর স্বপ্রচারিত আখ্যান উল্লিখিত রূপান্তরগুলোর কারিগর বা চালককে তার সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা প্রদান করে না। তুলনামূলকভাবে যে বিষয়টি জাতীয় আলোচনায় সেভাবে উঠে আসেনি তা হলো, সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্ব ও ব্যক্তিত্বে স্বাধীনতার গভীর ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব। এটি হলো পঁঞ্চম রূপান্তর একটি ভঙ্গুর পরিবেশ ও অদৃষ্টবাদে নিমজ্জিত দরিদ্র জনগণ, যাদের রয়েছে পরনির্ভরশীল মনোভাব, তারা একটি ব্যক্তিত্বের বিপ্লবের মধ্য দিয়ে গেছে। তারা হয়েছে আরো দৃঢ়, সুযোগের প্রতি সক্রিয় এবং জীবনের লক্ষ্যে আরো স্পষ্ট। অদৃষ্টবাদ আকাঙ্ক্ষা দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়েছে। এ মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের ফলে একজন নিরক্ষর কৃষক প্রযুক্তির আশীর্বাদকে আলিঙ্গন করেছেন, গ্রামীণ যুবকদের বৈশ্বিক শ্রমবাজারের সুযোগ অন্বেষণ করতে দেখা যাচ্ছে, দরিদ্র নারীদের অর্থনৈতিক অংশগ্রহণের আহ্বানে সাড়া দিতে দেখা যাচ্ছে এবং অবসরপ্রাপ্ত চাকরিজীবীদের নতুন উদ্যোক্তা হওয়ার সাহস করতে দেখা যাচ্ছে। ব্যক্তি পর্যায়ে এই উচ্চাকাঙ্ক্ষী বিপ্লবকে স্বীকার না করে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের রূপান্তরের যেকোনো ব্যাখ্যা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। পরিবর্তনের আরেকটি চালক ছিল সমাধানকেন্দ্রিক উদ্ভাবনের তৃণমূল সংস্কৃতি। স্বাধীনতার পর ‘জাতি নির্মাণ’ একটি সংকীর্ণ অভিজাত দৃষ্টিভঙ্গি হয়ে থেকে যায়নি, বরং জনপ্রিয় হয়ে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। এই সময়কালে বাংলাদেশে এনজিওগুলোর জন্ম হয়েছিল, তবে উদ্ভাবনের সন্ধান শুধু এনজিও সেক্টরের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং শেষ পর্যন্ত বহুক্ষেত্রগত আগ্রহে পরিণত হয়েছিল। ক্ষুদ্রঋণ, সংযোগ সড়ক, ওষুধনীতি, সামাজিক বনায়ন, শর্তসাপেক্ষ নগদ অর্থ স্থানান্তর, নতুন ফসলের জাত, সৌরবিদ্যুতের ব্যবহারসহ উদ্ভাবনের তালিকা ফলপ্রসূ এবং ধারাবাহিক উভয়ই হয়েছে। রাজনীতিও পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ চালক ছিল। সাধারণ রাজনীতি নয়, বরং স্থানীয় ও জাতীয় উভয় পর্যায়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাজনীতি এটা করেছিল, যেটি ১৯৯০ থেকে নতুন মাত্রা পেয়েছিল। এটা সত্য যে এ ধরনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা অনেক ক্ষেত্রে সহিংসতা সৃষ্টি ও আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটিয়েছিল, কিন্তু তা সত্ত্বেও এটি রাজনৈতিক নবায়নের অন্যতম একটি বাস্তবতা নিশ্চিত করেছিল। যেখানে আনুষ্ঠানিক জবাবদিহিতার প্রক্রিয়াগুলো এখনো তাদের যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারেনি, সেখানে এ প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক রাজনীতিই জবাবদিহিতার বলতে গেলে একমাত্র নিয়ামক হিসেবে কাজ করছিল। বাংলাদেশের রূপান্তরে পরিবর্তনের আরো দুটি স্বল্প পরিচিত চালক সাহায্য করেছিল। যদিও রাষ্ট্রের একটি বড় প্রাতিষ্ঠানিক উপস্থিতি রয়েছে, যা প্রধানত ঔপনিবেশিক শাসনের উত্তরাধিকার, স্বাধীনতার পর তা দায়বদ্ধ শাসন ও নীতি এবং নেতৃত্বের বাস্তবায়নে প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে পারেনি। রাজনৈতিক-প্রাতিষ্ঠানিক পরিমণ্ডলের মধ্যে এ ধরনের ঘাটতি সত্ত্বেও বাংলাদেশ আশ্চর্যজনকভাবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে নীতিগত সংস্কার করতে সক্ষম হয়েছে, যেগুলো বৃহত্তর কাঠামোয় প্রভাব ফেলেছে। ১৯৮০-এর দশকের ওষুধ নীতি, ১৯৯০-এর দশকের ব্যাংকিং সংস্কার, ২০০০ ও ২০১০-এর দশকের টেলিযোগাযোগ, ডিজিটাল সংস্কার এবং শর্তসাপেক্ষ নগদ অর্থ স্থানান্তর (কনডিশনাল ক্যাশ ট্রান্সফার), যা স্বাস্থ্য ও শিক্ষার এমডিজি অর্জন নিশ্চিত করেছিল। এগুলোর প্রত্যেকটি সম্ভব হয়েছিল এক ধরনের সফল নীতি উদ্যোগের মাধ্যমে। পলিসি মেকার, এনজিও, রাজনৈতিক নেতৃত্ব এক ধরনের সাময়িক পলিসি কোয়ালিশন এ ধরনের নীতি উদ্যোগগুলোকে মাঠে আনতে ও কার্যকর রূপ দিতে ভূমিকা রেখেছিল। বাংলাদেশে আরো একটি রূপান্তরের চালক ক্রিয়াশীল ছিল। মাঠ বাস্তবতা সচেতন উন্নয়ন ডিসকোর্সও বাংলাদেশের পরিবর্তনে একটি বড় ভূমিকা রেখেছে। চরম দারিদ্র্য নিরসন, সামাজিক সুরক্ষা, কৃষির আধুনিকীকরণ প্রত্যেক ক্ষেত্রেই উন্নয়ন ডিসকোর্স সুনির্দিষ্ট নীতি পদক্ষেপ চিহ্নিত করতে ভূমিকা রেখেছে। ৫০ বছরের অর্জনের উপাখ্যান সমাপ্ত করে এখন সময় সামনে তাকানোর। সমৃদ্ধি, সাম্য ও মর্যাদার স্বপ্নে উজ্জীবিত এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জন্ম নেয়া একটি জাতিরাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষার পরিধি কোনো একক গোষ্ঠীর বিষয় হতে পারে না। আজকে স্বপ্ন দেখাটাও একটি সম্মিলিত কাজ হতে হবে, যেখানে সব গোষ্ঠীর আশা-আকাঙ্ক্ষা সম-অধিকার ও সমমর্যাদায় জায়গা করে নিতে পারবে। নতুন ৫০ বছরের শুরুতে তাই রাজনীতি ও অর্থনীতি সংযোজিত হয়ে ভবিষ্যৎ দেখার এক নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে এসেছে। ৫০ বছরের যাত্রার মধ্যে দুই দশক বাংলাদেশের উন্নয়নের গতিপথের পরিপ্রেক্ষিতে ‘টার্নিং পয়েন্ট’ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। এ ‘টার্নিং পয়েন্ট’ দশকগুলোর বোঝাপড়া মূল্যায়ন করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো রাজনীতি ও অর্থনীতির এই সংযোগ আগামী দশকগুলোয় উন্নয়নের ফলাফলকে কীভাবে রূপ দিতে পারে তা জানা। এর মধ্যে প্রথমটি ছিল ১৯৯০-এর দশক। চারটি অসামান্য পদ্ধতির বৈশিষ্ট্য বিষয়টি পরিষ্কার করেছে এবং এ দশকটিকে টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে চিহ্নিত করার জন্য একটি গতিশীল আন্তঃক্রিয়া প্রত্যক্ষ করেছে। সেগুলো হচ্ছে বাজার অর্থনীতি ও প্রতিযোগিতামূলক পুঁজিবাদের একটি বিস্তৃত আদর্শিক আলিঙ্গন, প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক রাজনীতি, নীতি উদ্যোক্তার একটি শক্তিশালী স্রোত এবং তৃণমূল রূপান্তরের ওপর গুরুত্ব দিয়ে গতিশীলতা তৈরি। পদ্ধতির বৈশিষ্ট্যগুলোর এ সম্মিলন প্রবৃদ্ধির ত্বরণ, এমডিজির দ্রুত উপলব্ধি এবং সেই সঙ্গে ‘ব্রেন ড্রেন’ থেকে ‘ব্রেন গেইন’-এ স্থানান্তরকে উৎসাহিত করার ভিত্তি স্থাপন করেছে। ২০১০-এর দশকে অবশ্য একটি বিপরীত ধরনের টার্নিং পয়েন্ট দেখা গেছে। যদিও প্রবৃদ্ধির গতি অব্যাহত রয়েছে এবং ‘মধ্যম আয়ের’ দেশের উচ্চাকাঙ্ক্ষা গ্রহণ করা হয়েছে, দশকটি নির্দিষ্ট জটিল পদ্ধতির বৈশিষ্ট্যগুলোর বিপরীত দেখা গেছে। উন্নয়নের ফলাফলের অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রকৃতি তিনটি স্বতন্ত্র বিপরীতমুখী বিষয় প্রত্যক্ষ করেছে—ক্রমবর্ধমান আয়বৈষম্য, ঢাকা বনাম বাকি অঞ্চল—এ ধরনের স্থানিক বৈষম্য এবং প্রায় এক-তৃতীয়াংশ যুবকের বর্তমানে কর্মসংস্থান নেই; না তারা শিক্ষায় আছেন না প্রশিক্ষণে—এমন একটা সংকট চলছে। দারিদ্র্য হ্রাস-বৃদ্ধির স্থিতিস্থাপকতা মন্থর হয়েছে। প্রতিযোগিতামূলক পুঁজিবাদের পরিবর্তে স্বজনপ্রীতিমূলক পুঁজিবাদ প্রসার পাচ্ছে। স্কুলে তালিকাভুক্তির অগ্রগতি মানসম্পন্ন শিক্ষায় রূপান্তর হয়নি। মধ্যবিত্তের উল্লেখযোগ্য অংশ নিজেদের এবং তাদের পরিবারের জন্য টেকসই অর্থনৈতিক ভিত্তি স্থাপনে সংগ্রাম করছে। এমনকি নারীরা যখন গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের দূত হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, তখন লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা বৃদ্ধি পেয়েছে। অযোগ্য প্রশাসনের কারণে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি আশকারা পেয়েছে, যা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার পায়ে শিকল পরিয়ে দিচ্ছে। বাংলাদেশের ৫০ বছরের যাত্রা এভাবে নানা জটিলতায় ভরপুর। পরিবর্তন অবশ্যই গভীর এবং বাস্তব হয়েছে। কিন্তু ভবিষ্যৎ ধারাবাহিকভাবে কম অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং মধ্যম আয়ে উত্তরণের গুণমানসম্পন্ন উন্নয়নে চ্যালেঞ্জগুলোর বিষয়ে অনিশ্চয়তা প্রদর্শন করে। একসময়ের প্রতিশ্রুতিশীল দেশগুলোর ভাগ্য (দক্ষিণ আফ্রিকা, ব্রাজিল, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন) তথাকথিত মধ্যম আয়ের ফাঁদে পড়ার ক্ষেত্রে একটি কঠোর সতর্কতা হিসেবে সামনে এসেছে। বাংলাদেশের উন্নয়ন যাত্রার পরবর্তী পর্যায়ে বেসরকারি খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও বেসরকারি খাতের ক্রমবর্ধমান অভ্যন্তরীণ গতিশীলতা এ ভূমিকা কতটা কার্যকর থাকবে তার উত্তর দেয়। এর আগে আমাদের রাষ্ট্রীয় সাহায্যপ্রাপ্ত বেসরকারি খাত এবং স্বচালিত বেসরকারি খাত ছিল। এখন একটি নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। বাজারে প্রতিযোগিতামূলক দক্ষতা প্রমাণ করার চেয়ে ক্ষমতার নৈকট্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। শুধু ক্ষমতার নৈকট্যই নয়, আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক উভয়ই ক্ষেত্রেই ক্ষমতার উচ্চ সারণিতে অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। শীর্ষস্থানীয় বাণিজ্যিক কোম্পানিগুলো বেসরকারি খাতের পদ্ধতিগত অগ্রাধিকারগুলোর প্রতিনিধিত্ব করার প্রতি কম এবং ক্ষমতাসীন শক্তির সমর্থন থেকে সুবিধা নেয়ার দিকে বেশি মনোযোগী বলে মনে হয়। স্বার্থের দ্বন্দ্ব ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। অর্থনীতির লাভজনক ক্ষেত্রগুলো সিন্ডিকেট বা মুনাফাখোরদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে বলে মনে হচ্ছে। একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা হলো, অস্পষ্ট ‘বেসরকারি খাতের’ স্বার্থের আপাত সুবিধার জন্য রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে উপেক্ষা করা। এটি কি একটি নতুন টার্নিং পয়েন্ট? ‘মধ্যম আয়’ আকাঙ্ক্ষার একটি সংকীর্ণ অভিজাত কাঠামো, যা বাংলাদেশী সমাজের অন্তর্ভুক্তি ও আত্মমর্যাদার গভীর লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয় বা অভিজাত এ বয়ানটি উচ্চৈঃস্বরে সমর্থন করা প্রবৃদ্ধির উদ্দেশ্যগুলোর জন্য বিশেষভাবে কার্যকর নয়। বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সূচকে বাংলাদেশের পারফরম্যান্সের ওপর নজর দিলে সেই সূচকগুলোয় মারাত্মক দুর্বলতা দেখা যায়, যেগুলোর ওপর মধ্যম আয় আকাঙ্ক্ষার ত্বরান্বিত উপলব্ধি নির্ভর করে, যেমন প্রতিষ্ঠান, সরবরাহ, দক্ষতা, শ্রমবাজারের দক্ষতা, প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি এবং আইনের শাসন। এটা এমন নয় যে এ দুর্বলতাগুলোর  কোনোটাই স্বীকৃত নয়। নীতি প্রচুর, প্রকল্প প্রচুর। কিন্তু বিশ্বাসযোগ্য সংস্কার ও অগ্রগতি জবাবদিহিতাহীন ক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাছে গিয়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। উচ্চাকাঙ্ক্ষী নাগরিকরা নির্বিকার থাকে। বাংলাদেশ যদি তার প্রতিষ্ঠালগ্নের স্বপ্নের সঙ্গে পুনরায় সংযোগ স্থাপন করতে চায় তাহলে ‘মধ্যম আয়ের’ স্বপ্নকে গণতন্ত্রীকরণ করা একটি চ্যালেঞ্জ। ড. হোসেন জিল্লুর রহমান: নির্বাহী চেয়ারম্যান, পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি)

আরো পড়ুন

ফোটার আগেই ঝরে গেছে যে ফুল

‘আলোকিত ভবিষ্যতের স্বপ্ন নাকি মূর্খতাপ্রসূত পরিসমাপ্তি’ কোনটাকে বেছে নেব, তা নির্ভর করছে আমাদের ওপরেই।’ ‘হ্যাজ ম্যান আ ফিউচার’ গ্রন্থে এমন সতর্কবাণী শুনিয়েছিলেন সাহিত্যে নোবেলজয়ী দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেল। ব্রিটিশ এ গণিতবিদের

আরো পড়ুন

ইউনিভার্সের রহস্য উন্মোচনে জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ

এখনো পর্যন্ত মানুষের তৈরি সবচেয়ে শক্তিশালী টেলিস্কোপ James Webb Space Telescope। সংক্ষেপে JWAT। জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ। যদিও পুরো নাম জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ। জেমস টেলিস্কোপের আগে সবচেয়ে শক্তিশালী টেলিস্কোপটি

আরো পড়ুন

পরিবারের মধ্যে থেকেও নিরাপদ নয় কেন একটি কিশোরী মেয়ে?

পরিবারের মধ্যে থেকেও নিরাপদ নয় কেন একটি কিশোরী মেয়ে? সবার সমস্যার কারণগুলো সবারই জানা উচিত যাতে একই সমস্যা বারবার সৃষ্টি না হয়। পরিচয় গোপন রেখেও মেয়েরা তাদের সমস্যার কথাগুলো আলোচনা

আরো পড়ুন