
চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলায় ধান চাষ ক্রমাগত অলাভজনক হয়ে পড়ায় কৃষকরা এখন উন্নত জাতের ঘাস চাষের দিকে ঝুঁকছেন। সেচ ব্যবস্থার অভাব, জোয়ারের পানিতে ফসলি জমি তলিয়ে যাওয়া, উচ্চ শ্রমিক মজুরি এবং দীর্ঘমেয়াদি জলাবদ্ধতার কারণে প্রচলিত ধান চাষ করা দুরূহ হয়ে পড়েছে। প্রতিকূল এই পরিস্থিতি এড়াতে কৃষকরা বিকল্প হিসেবে ঘাস চাষ ও সাইলেজ প্রযুক্তির পথ বেছে নিয়েছেন। অনেকে নিজস্ব ডেইরি খামারের পশুখাদ্যের চাহিদা মেটাতে ঘাস চাষ করছেন, আবার কেউ কেউ জমি খামারিদের কাছে ইজারা দিয়ে ধানের চেয়ে প্রায় তিনগুণ বেশি মুনাফা পাচ্ছেন। চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলায় দিনদিন অলাভজনক হয়ে উঠছে ঐতিহ্যবাহী ধানচাষ। ফলে স্বল্প খরচের এই ঘাস গো-খাদ্যের বাজারে খামারিদের বড় অর্থনৈতিক সাশ্রয় দিচ্ছে।
শিকলবাহা ইউনিয়নের পূর্ববিল, কালারপোল, বেল্লাপাড়া ব্রিজ এবং জুলধা এলাকার বিস্তীর্ণ মাঠে এখন ধানের বদলে নেপিয়ার ঘাসের সবুজ সমারোহ দেখা যাচ্ছে। সরেজমিনে শিকলবাহা ইউনিয়নের পূর্ববিল, কালারপোল, বেল্লাপাড়া ব্রিজ এলাকা এবং জুলধা পর্যন্ত বিস্তীর্ণ মাঠ পরিদর্শনে দেখা যায়, যে খোলা মাঠে একসময় ধানের সোনালি শিষ দেখার কথা, সেখানে এখন সবুজের সমারোহ।
চরলক্ষ্যা ও বড়উঠানসহ বিভিন্ন এলাকাতেও এই প্রবণতা বাড়ছে, যা শীতকালীন সবজি চাষেও প্রভাব ফেলছে। কৃষকদের ভাষ্যমতে, ব্রি-২৮ বা ব্রি-২৯ জাতের ধান চাষে এক বিঘা জমিতে বছরে সর্বোচ্চ ২০ মণ ফলন পাওয়া যায়, কিন্তু সার, সেচ ও শ্রমিকের উচ্চ খরচে লাভ করা কঠিন। বিপরীতে, একবার ঘাস চাষ করলে বছরে পাঁচ-ছয়বার ফসল পাওয়া যায় এবং প্রতিবার কাটার পর বাড়তি কোনো খরচ ছাড়াই পুনরায় ফলন আসে। এক বিঘা জমিতে ঘাস চাষের জন্য চারা, শ্রমিক ও সার বাবদ মাত্র ৪ হাজার ৮০০ টাকা খরচ হয়। তবে একবার ঘাসের আবাদ করলে সেই জমিতে পুনরায় ধান চাষ করা বেশ কষ্টসাধ্য বলে জানিয়েছেন কৃষকরা। শিকলবাহার মতো উপজেলার চরলক্ষ্যা, জুলধা ও বড়উঠানেও ক্রমান্বয়ে ঘাস চাষ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এমনকি ঘাসের দাপটে কৃষকরা শীতকালীন শাকসবজি চাষেও আগ্রহ হারাচ্ছেন।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা রাকিবুল ইসলামের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কর্ণফুলীর কয়েকশ ডেইরি খামারে ২৫ হাজারের বেশি গবাদিপশু রয়েছে। জলাবদ্ধ ও লবণাক্ত পরিত্যক্ত জমিতে ঘাস চাষ এখন স্থানীয়দের জন্য লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। বর্তমানে এখানে প্রায় ৫০ হাজার পশুর জন্য কাঁচা ঘাসের চাহিদা রয়েছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আরিফুল হক জানান, বর্তমানে কর্ণফুলী দেশের দ্বিতীয় ডেইরি জোনে রূপ নিয়েছে। যদিও খামারিদের চাহিদায় ঘাস চাষের বিস্তার ঘটছে, তবুও চলতি মৌসুমে উপজেলার ১ হাজার ৩৮১ হেক্টর জমিতে ধান চাষ হয়েছে, যার লক্ষ্যমাত্রা ৪ হাজার ১১৩ টন নির্ধারণ করা হয়েছে। এখানে প্রায় ৫০ হাজার গবাদিপশুর কাঁচা ঘাসের চাহিদা থাকায় এটি এখন একটি লাভজনক ব্যবসা।