
দেশের শিশুদের শরীরে হামের টিকার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন এক গবেষণায় উদ্বেগজনক তথ্য বেরিয়ে এসেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, হামের টিকা দেওয়ার পরও প্রায় ২৭ শতাংশ শিশুর শরীরে প্রয়োজনীয় অ্যান্টিবডি বা রোগ প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে ওঠেনি। বিশেষ করে ৯ থেকে ১৪ মাস বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে এই প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকার এই অকার্যকর অবস্থা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে এবং স্বাস্থ্য বিভাগের বর্তমান টিকাদান কৌশল নিয়ে নতুন করে ভাবনার সময় এসেছে। জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের টিকা ঠিকমতো কাজে আসছে না। টিকা ও টিকাদানব্যবস্থা নিয়ে সরকারকে নতুন করে ভাবতে হবে। রোগ প্রতিরোধ গড়ে ওঠার প্রবণতা ৯ থেকে ১৪ মাস বয়সী শিশুদের তুলনায় ১৫ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের মধ্যে বেশি। ৬ মাস বয়সে টিকা দিলে ১০০টির মধ্যে ৫০টির রোগ প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে উঠবে। আবার ১২ মাস বয়সে টিকা দিলে ৯০ শতাংশ শিশুর শরীরে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে উঠবে। ৪৬ লাখ শিশুকে হিসাবের বাইরে রেখে হামের টিকা। টিকা উৎপাদন থেকে শুরু করে বিমানবন্দর হয়ে নানা পথ ঘুরে অবশেষে টিকা শিশুর কাছে পৌঁছায়। পুরো ব্যবস্থার মধ্যে টিকার কার্যকারিতা যেন বজায় থাকে, সে ব্যাপারে গুরুত্ব দিতে হবে। এ ব্যাপারে তিনি অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ, গ্যাভিসহ সবার সহযোগিতা চান।
গবেষণার সারসংক্ষেপ অনুযায়ী, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসে আইইডিসিআরের নেতৃত্বে ঢাকা, ময়মনসিংহ ও মুন্সিগঞ্জ জেলার ছয়টি উপশহর ও গ্রাম এলাকার ৩০৯ জন শিশুকে এই পরীক্ষার অন্তর্ভুক্ত করা হয়। যাদের বয়স ৯ থেকে ৫৯ মাসের মধ্যে। গবেষণায় অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর, রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর), জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান, ইস্টার্ন মেডিটেরানিয়ান পাবলিক হেলথ নেটওয়ার্ক এবং ঢাকা হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ। মোট ১২ জন গবেষক ও কর্মকর্তা এই গবেষণায় কাজ করেছেন। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের কাছ থেকে গবেষণার সারসংক্ষেপ পেয়েছে। এদের রক্তের নমুনা আইইডিসিআরের ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করা হয়।
গবেষণা ফলাফলে দেখা গেছে, ৩০৯ জন শিশুর মধ্যে কেবল ২০৩ জনের (৬৫.৭ শতাংশ) শরীরে কার্যকর অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে। ২১টি বা ৬.৮ শতাংশ শিশুর শরীরে অ্যান্টিবডির উপস্থিতি পাওয়া গেছে সীমান্ত পর্যায়ে (বর্ডার লাইন), যা নিশ্চিত কোনো সুরক্ষা দেয় না। অন্যদিকে, প্রায় ২৭.৫ শতাংশ বা ৮৫টি শিশুর শরীরে কোনো ধরনের অ্যান্টিবডিই তৈরি হয়নি। গবেষকরা বলছেন, সংক্রমণ বা রোগের বিস্তার রোধের জন্য শিশুদের শরীরে যে পরিমাণ রোগ প্রতিরোধক্ষমতা থাকা প্রয়োজন, বর্তমানে তা নেই। স্বাস্থ্য খাতের একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন বিজ্ঞানী বলেছেন, এই ২১ শিশুর শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে এটা বলা যাবে না, অ্যান্টিবডি তৈরি হয়নি এটাও বলা যাবে না।
চলতি বছরের মার্চ মাসে দেশে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার পর ২০ এপ্রিল থেকে ২০ মে পর্যন্ত দেশজুড়ে হাম-রুবেলার টিকা ক্যাম্পেইন পরিচালনা করা হয়।
স্বাস্থ্য বিভাগ তখন আশা করেছিল ক্যাম্পেইন শেষে তিন-চার সপ্তাহের মধ্যেই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে।
কিন্তু পাঁচ মাস অতিবাহিত হওয়ার পরও সংক্রমণ থামেনি। এর অর্থ বিপুলসংখ্যক শিশু হামে সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকিতে আছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এ বছর এখন পর্যন্ত ২ লাখ ২২ হাজার ৫৫২ জন হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে। গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের দেওয়া সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে ১ হাজার ৩৮৮ জন হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেছে।
এর মধ্যে নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়ে ১০৪ জন মারা গেছে এবং উপসর্গ নিয়ে মোট ১ হাজার ১২৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। অর্থাৎ হামের উপসর্গ নিয়ে এ বছর মোট মৃত্যু ১ হাজার ২৩৩ জন। দুঃখজনক হলো, মারা যাওয়া শিশুদের ৯২ শতাংশই টিকার আওতায় ছিল না।
টিকা বিশেষজ্ঞ তাজুল এ বারির মতে, টিকার কার্যকারিতা কমে যাওয়ার পেছনে পরিবহন ও সংরক্ষণকালীন তাপমাত্রার হেরফের হওয়ার মতো একাধিক কারণ থাকতে পারে। এছাড়া শিশুর অপুষ্টির মাত্রাও টিকার কার্যকারিতার ওপর প্রভাব ফেলে। অন্যদিকে, সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচিতে (ইপিআই) ব্যবহৃত টিকার গুণগত মান যাচাইয়ের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই, যা উদ্বেগের কারণ। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন অবশ্য এই গবেষণার নমুনা ছোট হওয়ায় এর ফলাফল নিয়ে তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্তে আসতে নারাজ। তিনি জানিয়েছেন, টিকার মান আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এবং এ নিয়ে বিতর্কের সুযোগ কম। টিকাবিশেষজ্ঞ তাজুল এ বারি বলেন, ‘টিকার কার্যকারিতা নষ্ট বা হ্রাস পেতে পারে একাধিক কারণে। ৩০টি উপজেলার প্রতিটি থেকে ১০০ করে শিশুর নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে।
উন্নততর পর্যালোচনার জন্য জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে বর্তমানে তিন হাজার শিশুর ওপর আরও একটি বড় পরিসরের গবেষণা চলছে, যার ফলাফল নভেম্বর মাসের শেষ নাগাদ পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর আগেও গত ১৪ অক্টোবর ৭০ জন দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞের সমন্বয়ে গঠিত একটি দল ইপিআইয়ের কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে প্রতিবছর প্রায় ২০ শতাংশ শিশু নিয়মিত টিকা থেকে বাদ পড়ার তথ্য তুলে ধরেছিল। ৭০ জন দেশি–বিদেশ বিশেষজ্ঞকে নিয়ে গঠিত যৌথ স্বাধীন পর্যালোচনা দল ১৪ অক্টোবর রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে দেশে হামের প্রাদুর্ভাবের কারণ তুলে ধরে।
রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক বে-নজির আহমেদের মতে, এই পরিস্থিতি সামাল দিতে টিকার কভারেজ ৯৫ শতাংশের ওপরে নেওয়া জরুরি। তিনি পরামর্শ দিয়েছেন, পাঁচ বছরের বেশি বয়সী শিশুদেরও টিকার আওতায় আনতে হবে এবং প্রয়োজনে ১৮ বছর পর্যন্ত এই সীমা সম্প্রসারণ করতে হবে। এছাড়া প্রতি চার বছর অন্তর জাতীয় পর্যায়ে টিকা ক্যাম্পেইন নিশ্চিত না করলে হামের সংকট নিরসন কঠিন হয়ে পড়বে। শিশুরা টিকা পেয়েছে কি না, গবেষকেরা তা নিশ্চিত হন টিকা কার্ড দেখে এবং অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে। একপর্যায়ে তা ১৮ বছর পর্যন্ত নিয়ে যেতে হবে। বড় পরিকল্পনা হাতে না নিলে হামের জটিল পরিস্থিতি থেকে বাংলাদেশ বের হতে পারবে না।’।