
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর জেলা ও মহানগর পর্যায়ের নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। ঘোষিত ৭৭টি সাংগঠনিক শাখার মধ্যে ৫১টিতেই আগের আমিররা পুনরায় দায়িত্ব পেয়েছেন। দলের রুকনদের (সদস্য) গোপন ভোটে ২০২৭-২৮ মেয়াদের জন্য এই নেতৃত্ব নির্ধারিত হয়। রাজধানী মগবাজারে অবস্থিত দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে নির্বাহী পরিষদের বৈঠকে আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান নির্বাচিতদের নাম ঘোষণা করেন। জামায়াত গত বুধবার রাতে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ২০২৭-২৮ মেয়াদের জন্য নির্বাচিত জেলা ও মহানগর আমিরদের নাম জানায়। জামায়াতের নেতা ও জেলা প্রতিনিধিদের মাধ্যমে ৪৯টি শাখার নেতৃত্বের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি লক্ষ্মীপুর-৪ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ছিলেন।
দীর্ঘদিন ধরে একই ব্যক্তি নেতৃত্বে থাকা নিয়ে এর আগে সাংগঠনিক পর্যায়ে আলোচনার জন্ম হয়েছিল। নতুন মেয়াদের নির্বাচনে কিছু শাখায় পরিবর্তন এলেও, অন্তত ১০টি জেলায় আমিরের দায়িত্ব পালন করছেন এমন নেতারা রয়েছেন যারা এক দশক বা তার বেশি সময় ধরে এই পদে আছেন। এর মধ্যে ঝালকাঠির হাফিজুর রহমান ২০০৪ সাল থেকে টানা ২২ বছর জেলা আমিরের দায়িত্বে থেকে আবারও নির্বাচিত হয়েছেন। এছাড়া রাঙামাটির মোহাম্মদ আবদুল আলীম ও বান্দরবানের এস এম আবদুছ ছালাম আজাদ ১৬ বছর এবং সিরাজগঞ্জের মো. শাহিনুর আলম ১৪ বছর দায়িত্ব পালনের পর পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে অন্তত ১০ জেলার আমির এক দশক বা তার বেশি সময় ধরে দায়িত্ব পালন করছেন। এসব জেলায় ১৭ থেকে ২৩ বছর পর্যন্ত একই ব্যক্তি আমিরের দায়িত্বে ছিলেন। জামায়াতের জেলা পর্যায়ে বছরের পর বছর একই ব্যক্তির নেতৃত্বে থাকা নিয়ে সম্প্রতি ‘ জামায়াতের জেলা নেতৃত্বে বছরের পর বছর একই মুখ ’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। দীর্ঘদিনের কয়েকজন আমিরের জায়গায় নতুন মুখ।
বগুড়া জেলা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ময়মনসিংহ জেলা, শেরপুর, মেহেরপুর, টাঙ্গাইল ও কুড়িগ্রামের মতো এলাকাগুলোতেও পুরনো নেতৃত্ব বহাল রয়েছে। কুড়িগ্রামের মো. আজিজুর রহমান ১৯৯৬ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত দীর্ঘ ২২ বছর আমির ছিলেন, গত বছর তিনি পুনরায় দায়িত্ব পান এবং এবারও নির্বাচিত হয়েছেন। এছাড়া নাটোর, বরিশাল মহানগর, বরগুনা, নড়াইল, ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ এবং মানিকগঞ্জের আমিররা পঞ্চম মেয়াদে নির্বাচিত হয়েছেন।
তবে খাগড়াছড়ি, জয়পুরহাট, খুলনা, বরিশাল জেলা, রাজবাড়ী ও লক্ষ্মীপুরের মতো কিছু এলাকায় নেতৃত্বে পরিবর্তন এসেছে। খাগড়াছড়িতে দীর্ঘ ২৮ বছর দায়িত্ব পালনের পর সৈয়দ মো. আবদুল মোমেনের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন মিনহাজুর রহমান। লক্ষ্মীপুরে নতুন আমির হয়েছেন এ আর হাফিজুল্লাহ। এছাড়া মহানগর শাখাগুলোর মধ্যে বগুড়ায় আবদুল মালেক, রাজশাহীতে মো. জাহাঙ্গীর, ময়মনসিংহে আসাদুজ্জামান সোহেল ও গাজীপুরে খায়রুল হাসান নতুন নেতৃত্বে এসেছেন।
নেতৃত্ব নির্বাচনের এই প্রক্রিয়া গত ৯ অক্টোবর শুরু হয়ে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত চলে। দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ টি এম মা’ছুমের নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন পুরো প্রক্রিয়াটি পরিচালনা করে। প্রতিটি শাখার জন্য আলাদা প্রিসাইডিং কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়েছিল।
কিছু শাখায় ভোট গ্রহণ প্রক্রিয়ায় ভিন্নতা বা জটিলতা দেখা গেছে। যেমন, কুমিল্লা মহানগর শাখা এবং জামালপুর জেলায় আমিরের নাম ঘোষণা করা হয়নি। গত ১৪ অক্টোবর কুমিল্লায় কমিটি গঠন নিয়ে সংঘর্ষ ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় মহানগর কমিটি ভেঙে দেওয়া হয় এবং তৎকালীন আমির কাজী দ্বীন মোহাম্মদকে অব্যাহতি দেওয়া হয়, তাই সেখানে ভোট হয়নি। জামালপুর জেলায় ভোট গ্রহণ হলেও পর্যালোচনার স্বার্থে ফল প্রকাশ স্থগিত রাখা হয়েছে। কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে গত ১৪ অক্টোবর জামায়াতের কুমিল্লা মহানগর কার্যালয় চত্বরে ককটেল বিস্ফোরণ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।
বারবার একই ব্যক্তি নির্বাচিত হওয়ার বিষয়টি নিয়ে দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল হালিম জানান, গঠনতন্ত্র অনুযায়ী রুকনরা তাদের পছন্দের প্রার্থীর জন্য ভোট দেন। তিনি দাবি করেন, ইসলামি সংগঠনের কাজের ধরন বুঝে উঠতে সময় লাগে, তাই অভিজ্ঞতার কারণে অনেককে একাধিকবার নির্বাচিত করেন রুকনরা। দলটির ভেতরেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা ছিল। নির্বাচনী প্রচারে ‘দাঁড়িপাল্লায় ভোট দেন, জান্নাত অবধারিত’ মন্তব্য করে তিনি ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছিলেন।
নতুন করে নির্বাচিত জেলা আমিরের তালিকায় আরও রয়েছেন ঠাকুরগাঁওয়ের মোহাম্মদ আলমগীর, দিনাজপুরের এনামুল হক, রংপুরের এনামুল হক, পাবনার নজরুল ইসলাম, নওগাঁর মাহফুজুর রহমান, ঝিনাইদহের আবদুল আউয়াল, মাগুরার সাঈদ আহমাদ, পিরোজপুরের আ. রব, কিশোরগঞ্জের আজিজুল হক, গাজীপুরের সেফাউল হক, নরসিংদীর ইব্রাহিম ভূঁইয়া, ফরিদপুরের ইমতিয়াজ উদ্দিন আহমদ এবং সুনামগঞ্জের শামসুদ্দিন।
নারায়ণগঞ্জ জেলায় মাসুদুর রহমান চলতি বছরের শুরুতে ভারপ্রাপ্ত আমিরের দায়িত্ব পান, এবার তিনি পূর্ণাঙ্গ আমির হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণকারী জেলা ও মহানগর শাখাগুলোর স্থানীয় রুকন সম্মেলনে ভোটের মাধ্যমে এই ফলাফল নিশ্চিত করা হয়েছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।