
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যখনই কোনো ষড়যন্ত্র হয়েছে এবং গণতন্ত্র হুমকির মুখে পড়েছে, তখনই ৭ নভেম্বরের ঐক্যবদ্ধ বিপ্লবের চেতনায় বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়িয়েছে। শনিবার (৭ নভেম্বর) জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষ্যে রাজধানীর বনানীর আর্মি স্টেডিয়ামে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। অনুষ্ঠানের শুরুতেই তিনি তরুণ প্রজন্মের ডিসপ্লে উপস্থাপনার ভূয়সী প্রশংসা করে তাদের অভিনন্দন জানান। তারেক রহমান বলেন, ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর ঘিরে আমাদের তরুণ প্রজন্ম যেভাবে ইতিহাসভিত্তিক একটি মনোমুগদ্ধকর ডিসপ্লে উপস্থাপন করেছেন, প্রথমেই আমি তাদের আন্তরিক অভিনন্দন জানাই। প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশ ফ্যাসিবাদ মুক্ত হয়েছে। সুতরাং যতদিন বাংলাদেশ থাকবে ৭ নভেম্বর সিপাহি জনতার ঐক্যবদ্ধ বিপ্লবের গুরুত্ব এবং তাৎপর্যও ততদিন প্রাসঙ্গিক থাকবে। তারেক রহমান বলেন, একটি জাতির ইতিহাস কেবল অতীতের স্মৃতিচারণ নয়; শুদ্ধ ইতিহাস একটি জাতির আত্মপরিচয়, আত্মমর্যাদা এবং সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রেরণা। আজকের এ আয়োজনের বিশেষত্ব হলো- আমাদের হাজার হাজার কিশোর-কিশোরী; তরুণ-তরুণী যারা এই স্টেডিয়ামে ৭ নভেম্বর ঘিরে যেভাবে নির্মোহভাবে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ডিসপ্লে করেছেন, আমি বিশ্বাস করি- ইতিহাস সচেতেন এই প্রজন্ম ৭ নভেম্বরের প্রেরণায়/ উজ্জীবিত এবং ঐক্যবদ্ধ। অভিভাবক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হলো- তারুণ্যের সব সম্ভাবনাকে বিকশিত করার প্রয়োজনীয় এবং উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা।
তারেক রহমান বলেন, ১৯৭৫ সালের এই দিনে দেশপ্রেমিক সিপাহি ও জনতা ঐক্যবদ্ধভাবে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে চলা সব চক্রান্ত রুখে দিয়েছিল।
ঐতিহাসিক এই দিনটি বাংলাদেশের জন্য শত্রু-মিত্র চেনার দিন হিসেবে পরিচিত। সে সময় ২ নভেম্বর মধ্যরাতে স্বাধীনতার ঘোষক তৎকালীন সেনাপ্রধান লেফট্যানেন্ট জেনারেল জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করে যে ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছিল, সিপাহি জনতার বিপ্লব তা ব্যর্থ করে দেয়। এ কারণেই ৭ নভেম্বর দেশপ্রেমিক ও গণতন্ত্রকামী মানুষের কাছে জাতীয় ঐক্যের চেতনার বাতিঘর হয়ে আছে।
যারা বাংলাদেশকে তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করতে চেয়েছিল, তাদের পতন ঘটেছিল ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর। তবে পরাজিত অপশক্তির ষড়যন্ত্র থেমে থাকেনি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পরবর্তীকালে তারা মহাজোটের নামে ক্ষমতায় এসে দেশের মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত করেছে, পিলখানায় সেনা হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে এবং ফ্যাসিবাদী শাসন কায়েম করেছে। তবে ২০২৪ সালে বীর ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে পুনরায় সেই পরাজিত অপশক্তির পতন হয়েছে। ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে শহীদ ও আহতদের প্রতি তিনি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। ১৯৭৫ সালের নভেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র এবং চক্রান্ত চরম আকার ধারণ করেছিল। তিনি বলেন, যারা বাংলাদেশকে তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করে রাখতে চেয়েছিল, যারা জনগণের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অধিকার হরণ করে দেশে একদলীয় শাসন কায়েম করতে চেয়েছিল, যে অপশক্তি দেশের শৌর্য বীর্য সাহস এবং সম্মানের প্রতীক সশস্ত্র বাহিনীর গৌরবকে ভূলুণ্ঠিত করতে। 1975, 7. বিডিআর পিলখানায় পরিকল্পিত সেনা হত্যাযজ্ঞ ঘটিয়ে সেনাবাহিনীর গৌরব এবং মর্যাদাকে ভূলুণ্ঠিত করেছিল। ফ্যাসিবাদবিরোধী দীর্ঘ আন্দোলনে যারা হতাহত হয়েছেন, ২০২৪ সালের বীর ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানে যারা শহীদ হয়েছেন, আহত হয়েছেন, আজকের এই দিনে আমি তাদের অবদানকেও গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ৭১ সালে যুদ্ধ হয়েছিল স্বাধীনতা অর্জনের জন্য, আর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সর্বস্তরের মানুষ নেমেছিল সেই স্বাধীনতা রক্ষার জন্য। সময়ের পরিক্রমায় প্রমাণিত হয়েছে যে, ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পথরেখা নির্ধারণের দিন। যারা এই পথরেখা থেকে বিচ্যুত হয়েছে, তারাই দেশের সার্বভৌমত্বকে হুমকির মুখে ফেলেছে। আজ আমাদের অঙ্গীকার হতে হবে, ভবিষ্যতে যেন আর কেউ দেশের জনগণের অধিকার হরণ করতে না পারে বা দেশকে তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করতে না পারে। ‘১৯৭১ সালের যুদ্ধ ছিল স্বাধীনতা অর্জনের। তিনি বলেন, ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যেভাবে দেশের সার্বভৌমত্বের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন, ১৯৭১ সালেও একইভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য রণাঙ্গনে সম্মুখ সমরে লড়াই করেছেন। এ অঙ্গীকার বাস্তবায়নে প্রয়োজন জাতীয় ঐক্য।
জাতিসত্তা সম্পর্কে তিনি বলেন, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই বাংলাদেশী পরিচয়েই গর্বিত। এই ঐক্যই আমাদের জাতীয় পরিচয়। ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর এই ‘আমরা বাংলাদেশি’ পরিচয়ের ভিত্তি তৈরি করেছিল। আজ তরুণ প্রজন্মকে ইতিহাসের সঠিক শিক্ষায় দীক্ষিত হতে হবে। যারা জাতীয়তাবোধে অনুপ্রাণিত, তাদের দ্বারা দেশের ঐক্য সুদৃঢ় হয়। ৭১-এর যুদ্ধ, ৭৫-এর সিপাহি জনতার বিপ্লব, ৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন কিংবা ২০২৪-এর ফ্যাসিবাদবিরোধী গণঅভ্যুত্থানে তরুণরাই প্রমাণ করেছে, তারা দেশের স্বার্থের প্রশ্নে আপসহীন।
স্বাধীনতার পতাকাকে সমুন্নত রেখে অর্থবহ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা প্রতিটি প্রজন্মের দায়িত্ব বলে তিনি মন্তব্য করেন। একটি নিরাপদ, সমৃদ্ধ ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য নিয়ে বর্তমান সরকার কাজ করছে। পরিশেষে তিনি দেশপ্রেমিক জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, এই ঐতিহাসিক দিনে সবার দীপ্ত উচ্চারণ হোক—’দিল্লি নয় পিন্ডি নয়, নয় অন্য কোনো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’।” ঐতিহাসিক এই দিনে সবাইকে নজরুলবর্ষের শুভেচ্ছা।