
রাজধানীর কারওয়ান বাজারে মাছের আড়ত থেকে চাঁদাবাজির অভিযোগে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) আদাবর থানা ছাত্রদলের আহ্বায়ক নয়ন হোসেনকে গ্রেপ্তার করেছে। গত বৃহস্পতিবার ডিবি পুলিশ এই গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করে। কারওয়ান বাজার এলাকায় চাঁদাবাজির একটি মামলায় তাঁকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার মো. জিয়াউদ্দিন আহম্মেদ জানিয়েছেন, নয়নের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির একাধিক অভিযোগ রয়েছে এবং সেগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। অভিযোগের সত্যতা মিললে জড়িত অন্যদেরও আইনের আওতায় আনা হবে। রাস্তা খুঁড়ে পানির লাইনের কাজ করা হচ্ছে। পরে বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানো হয়। ছাত্রদলের আদাবর থানা কমিটি বিএনপির ছাত্রসংগঠনটির ঢাকা মহানগর পশ্চিমের আওতাধীন। এটা আসলে তাঁর বিরুদ্ধে বড় ধরনের ষড়যন্ত্র। অন্য কারও সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তাঁদেরও আইনের আওতায় আনা হবে।
কারওয়ান বাজারের ঘটনায় গ্রেপ্তার করা হলেও আদাবর এলাকায় নয়ন এবং তাঁর অনুসারীদের বিরুদ্ধে দখলদারি ও চাঁদাবাজির বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। মনসুরাবাদ হাউজিংয়ের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, এলাকায় সড়ক সংস্কারের সময় পানি ও পয়োনিষ্কাশন নালার কাজ নিজস্ব লোক দিয়ে করাতে ভবনমালিকদের বাধ্য করতেন নয়নের অনুসারীরা। কাজ শেষে বাড়িপ্রতি ২০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত জোর করে আদায় করা হতো। এ ছাড়া নির্মাণাধীন ভবন, ফুটপাতের দোকান ও এমব্রয়ডারি কারখানা থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায়ের অভিযোগও রয়েছে তাঁদের বিরুদ্ধে। নয়ন ও তাঁর অনুসারীদের কর্মকাণ্ডে এলাকার বাসিন্দারা অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন বলে জানান তাঁরা। সড়কটির দুই পাশে রয়েছে ৫০ থেকে ৬০টি বাড়ি।
ভুক্তভোগী স্থানীয়রা জানান, মনসুরাবাদ হাউজিংয়ের ৬ নম্বর সড়কে সিটি করপোরেশনের সংস্কারকাজ চলাকালে নয়নের লোকজন তাদের কাজগুলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়।
৬৯ ও ৭০ নম্বর বাড়ির মালিকের কাছে নালার কাজের জন্য ৫৫ হাজার টাকা দাবি করা হলে তিনি অস্বীকৃতি জানান।
এ সময় তাঁকে হুমকি দেওয়া হয়।
বাড়ির তত্ত্বাবধায়ক সাজু হোসেন জানান, তারা পরিচিত মিস্ত্রি দিয়ে কাজ করতে চাইলেও ছাত্রদল নেতা নয়নের পরিচয় দেওয়া চার-পাঁচজন এসে জোরপূর্বক কাজ সম্পন্ন করে টাকা দাবি করেন। একই সড়কের অন্য এক বাড়ির নিরাপত্তাকর্মী মো. শহীদুল্লাহ জানান, তাদের বাড়ির কাজের জন্য ভয়ভীতি দেখিয়ে তিন ধাপে ২৩ হাজার ৫০০ টাকা আদায় করা হয়েছে, যা অন্য মিস্ত্রি দিয়ে করালে ১০ হাজারের মধ্যে সম্ভব হতো।
আদাবর এলাকায় নয়ন এবং সদস্যসচিব মনিরুজ্জামান মজুমদার জসিমের বিরুদ্ধে বাড়ি দখলেরও অভিযোগ রয়েছে। গত বছরের ২৫ ফেব্রুয়ারি আলিফ হাউজিংয়ের একটি বাড়ি দখলের চেষ্টার সময় নয়নের অনুসারীরা ভাঙচুর চালায় বলে অভিযোগ করেন স্থানীয় বিএনপি নেতা মাসুম বাবুল। ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, ঘটনার সময় নয়ন ও মনিরুজ্জামান ছাড়াও মাহফুজ আলম, আবির হোসেন, শাহাদাত হোসেন, জাকির হোসেন ও সাদেক হোসেনসহ ছাত্রদলের বেশ কিছু নেতাকর্মী সেখানে উপস্থিত ছিলেন। নয়ন হোসেন ও মনিরুজ্জামান জসিমের নেতৃত্বে ২০২৫ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় বিএনপি নেতা মাসুম বাবুলের আলিফ হাউজিংয়ের একটি বাড়ি দখলের চেষ্টা করা হয় বলে এই বিএনপি নেতার অভিযোগ। নয়নেরা বাড়িটি দখল করতে পারেননি, কিন্তু ভাঙচুর করেন বলে জানান মাসুম বাবুলের পরিবারের সদস্যরা। বাইরে থেকে বাড়িটির জানালার কাচ ভাঙচুর করা হয়। ফুটেজে আদাবর থানা ছাত্রদলের সদস্যসচিব মনিরুজ্জামান মজুমদার, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক মাহফুজ আলম, যুগ্ম আহ্বায়ক আবির হোসেন, ৩০ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদলের আহ্বায়ক শাহাদাত হোসেন, ছাত্রদল নেতা জাকির হোসেন এবং ১০০ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদলের সদস্যসচিব সাদেক হোসেনকে দেখা যায়।
অভিযোগের বিষয়ে মনিরুজ্জামান মজুমদার বলেন, তিনি ঘটনাস্থলে মীমাংসার জন্য গিয়েছিলেন এবং কোনো ধরনের চাঁদাবাজি বা দখলের সঙ্গে তিনি যুক্ত নন। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে প্রতিপক্ষরা এসব অপপ্রচার ছড়াচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি। বিলুপ্ত কমিটির সাধারণ সম্পাদক আকরাম আহমেদ দাবি করেছেন, আদাবরের ঘটনা আড়াল করতে কারওয়ান বাজারের মামলা ব্যবহার করা হয়েছে। তিনি বলেন, আদাবরের চাঁদাবাজির অভিযোগ থাকলে সুনির্দিষ্ট মামলা দেওয়া উচিত ছিল। এর আগে মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলার ঘটনার পর কেন্দ্রীয় ছাত্রদল এই থানা কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করেছিল। তবে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, এই ছাত্রদল নেতার নিজের এলাকা আদাবরে চাঁদাবাজি, দখলসহ নানা ঘটনায় তাঁর জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। গত মাসে এক রাতে মিরপুরে মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা চালিয়ে সেটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর এই কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় ছাত্রদল।