
যে হাতে একদিন দেশের স্বাধীনতার স্বপ্ন বুনেছিল, আজ সেই হাত কাঁপছে। বার্ধক্যের কারণে নয়—কাঁপছে নিজের সন্তানের দেওয়া কষ্টে। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এক মুক্তিযোদ্ধা বাবা দাঁড়িয়ে আছেন এমন এক যুদ্ধে, যেখানে কোনো বিজয়ের গান নেই, আছে শুধু নিঃসঙ্গতা, অপমান আর চোখের জল।
নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার সোনাদিয়া ইউনিয়নের চর ফকিরা গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল মন্নান। তিনি একজন গর্বিত মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক সেনাসদস্য। পাঁচ সন্তানের জনক এই মানুষটি আজ সবচেয়ে বেশি অসহায় নিজের ঘরের ভেতরেই। তাঁর অভিযোগ—ছেলে রায়হান ও পুত্রবধূর নির্যাতনে তিনি দিনের পর দিন চরম কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন।
অনেকবার স্থানীয়ভাবে বিচার চেয়েছেন। দরজায় দরজায় ঘুরেছেন ন্যায়ের আশায়। কিন্তু কোথাও শান্তির কোনো পথ খুঁজে পাননি। শেষ পর্যন্ত ভাঙা কণ্ঠ আর কান্নাভেজা চোখ নিয়ে তিনি হাজির হন সোনাদিয়া ইউনিয়ন পরিষদে। সংবাদ সম্মেলনের মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলতে গিয়ে বারবার থমকে যাচ্ছিলেন। সন্তানের হাতে নির্যাতিত হওয়ার যন্ত্রণা যেন ভাষায় ধরা দিচ্ছিল না।
আব্দুল মন্নান বলেন, “এই বয়সে আমার চাওয়ার কিছুই নেই। একটু শান্তি, একটু সম্মান নিয়ে বাঁচতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সম্পত্তির লোভ আর অন্যের প্ররোচনায় আমারই ছেলে আমার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। দেশের জন্য জীবন বাজি রেখেছি, অথচ আজ নিজের ঘরেই আমি নিরাপদ নই।”
কথা বলতে বলতে তাঁর চোখ বেয়ে নেমে আসে অশ্রু। উপস্থিত অনেকেই চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি। তিনি জানান, দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হলেও সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে এতদিন নীরব ছিলেন। কিন্তু কষ্ট যখন সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছে, তখন বাধ্য হয়েই তিনি সমাজ ও প্রশাসনের কাছে বিচার চাইছেন।
একজন বাবার কান্না, একজন মুক্তিযোদ্ধার অসহায় আর্তনাদ—এই দৃশ্য যেন প্রশ্ন ছুড়ে দেয় আমাদের সবার বিবেকের দিকে। যে মানুষটি দেশের স্বাধীনতার জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত ছিলেন, আজ তাঁর জীবনের শেষ সময়ে কেন এমন অপমান আর অবহেলা সহ্য করতে হচ্ছে?
এলাকাবাসী ও সচেতন মহল এ ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা অবিলম্বে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ ও মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মন্নানের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
একটি স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক হয়েও আজ একজন মুক্তিযোদ্ধা কেবল এই কথাটুকুই চাইছেন—
“আমাকে একটু শান্তিতে বাঁচতে দিন।”