
মাদক উদ্ধারে সাংবাদিকের বাড়িতে অভিযান। ঘণ্টাখানেক তল্লাশি। শেষ পর্যন্ত মিলল না মাদকের অস্তিত্ব। অথচ অভিযানের আগেই বিষয়টি জানতেন না সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)। এর মধ্যেই সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর মন্ত্রণালয়ের ফোন। এবার পুরো ঘটনার তদন্তে নেমেছে জেলা প্রশাসন।
কুড়িগ্রামের রৌমারীতে স্থানীয় সাংবাদিক ও দৈনিক মানবজমিনের উপজেলা প্রতিনিধি রফিকুল ইসলাম সাজুর বাড়িতে ‘মাদক উদ্ধারের’ নামে অভিযান চালানোর ঘটনায় সহকারী কমিশনার (ভূমি) রাফিউর রহমানের বিরুদ্ধে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
অভিযানটি কোনো ‘খারাপ উদ্দেশ্য’ বা প্রতিশোধস্পৃহা থেকে পরিচালিত হয়েছিল কিনা, সেটিই এখন তদন্তের মূল বিষয়।
কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব)কে আহ্বায়ক এবং রৌমারী ইউএনও মাহবুবুল হাসানকে সদস্য সচিব করে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী ৬ সেপ্টেম্বরের মধ্যে কমিটিকে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
পথিমধ্যে সাংবাদিকের বাড়িতে ‘হানা’
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) বেলা ১১টার দিকে দুই পুলিশ সদস্য ও কয়েকজন আনসার সদস্যকে সঙ্গে নিয়ে রৌমারীর সবুজ পাড়ায় সাংবাদিক সাজুর বসতবাড়িতে অভিযান চালান এসিল্যান্ড রাফিউর রহমান।
এসিল্যান্ডের ভাষ্য, সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে মাদক উদ্ধারে অভিযানটি পরিচালনা করা হয়। তবে বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে কোনো মাদক পাওয়া যায়নি।
অভিযোগ রয়েছে, তল্লাশির সময় বাড়ির বিভিন্ন জিনিসপত্র তছনছ করা হয়। অভিযান শেষে কোনো মাদক না পেয়েই ফিরে যান কর্মকর্তারা।
‘আমাকেই জানানো হয়নি’
ঘটনার সবচেয়ে আলোচিত বিষয়—অভিযানের আগে সংশ্লিষ্ট ইউএনওকেও জানানো হয়নি।
রৌমারী ইউএনও মাহবুবুল হাসান বলেন, এসিল্যান্ডকে সার বিতরণের স্থানে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু তিনি পথিমধ্যে সাংবাদিক সাজুর বাড়িতে অভিযান চালান। অভিযানের আগে তাকে কিছু জানানো হয়নি। অভিযান শেষে তিনি বিষয়টি জানতে পারেন।
ইউএনওর এই বক্তব্যের পর অভিযানের উদ্দেশ্য ও প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।
নামজারি নিয়ে প্রশ্ন, এরপরই অভিযান?
সাংবাদিক রফিকুল ইসলাম সাজুর অভিযোগ, একজন নাগরিকের জমির নামজারি সম্পন্ন হওয়ার মাত্র তিন দিনের মাথায় কোনো নোটিশ বা শুনানি ছাড়াই সেটি বাতিল করেন এসিল্যান্ড।
এ বিষয়ে গত বুধবার ফোনে তাকে প্রশ্ন করেন সাজু। এতে এসিল্যান্ড ক্ষুব্ধ হন বলে অভিযোগ সাংবাদিকের।
সাজুর দাবি, সেই ক্ষোভ থেকেই তাকে ফাঁসাতে পরিকল্পিতভাবে তার বাড়িতে মাদক উদ্ধারের অভিযান চালানো হয়েছে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, রৌমারীতে যোগদানের পর থেকেই এসিল্যান্ডের বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। নিরপেক্ষ তদন্ত হলে সেসব অভিযোগেরও প্রমাণ পাওয়া যাবে।
মন্ত্রণালয়ের ফোনেই নড়েচড়ে প্রশাসন
কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেব নাথ বলেন, সাংবাদিকের বাড়িতে অভিযান নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর মন্ত্রণালয় থেকে ফোন করে বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়। এরপরই তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
এসিল্যান্ড কোনো ‘ইল মোটিভ’ বা খারাপ উদ্দেশ্য নিয়ে অভিযান চালিয়েছিলেন কিনা—এমন প্রশ্নের জবাবে জেলা প্রশাসক বলেন, তদন্ত করে বিষয়টি দেখা হবে।
জেলা প্রশাসক জানান, এসিল্যান্ডের বিরুদ্ধে আগেও কিছু অভিযোগ পাওয়া গেছে। এরই মধ্যে তাকে বদলি করে ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর তা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে এবং কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে বলেও জানান তিনি।
অনিয়মের খবর প্রকাশ করায় ক্ষোভ?
স্থানীয় সাংবাদিকদের অভিযোগ, ভূমি সেবায় ঘুষ বাণিজ্য ও ক্ষমতার অপব্যবহারসহ বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করায় সাংবাদিক সাজুসহ কয়েকজন সাংবাদিকের ওপর এসিল্যান্ড ক্ষুব্ধ ছিলেন।
কর্মস্থল ছাড়ার আগে সেই ক্ষোভ থেকেই সাজুর বাড়িতে মাদক উদ্ধারের নামে অভিযান চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ তাদের।
তবে এসিল্যান্ডের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতেই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।
এখন তদন্ত কমিটির সামনে মূল প্রশ্ন—মাদক না পাওয়া ওই অভিযান কি নিয়মিত প্রশাসনিক কার্যক্রম ছিল, নাকি এর পেছনে ছিল ব্যক্তিগত ক্ষোভ বা অন্য কোনো উদ্দেশ্য?
আগামী ৬ সেপ্টেম্বরের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা। সেই প্রতিবেদনের ওপরই অনেকটা নির্ভর করছে বহুল আলোচিত এই ‘মাদক অভিযান’-এর পরবর্তী পদক্ষেপ।