
নিত্যপণ্যের আকাশচুম্বী দাম আর আয়-ব্যয়ের বড় ধরনের অসামঞ্জস্যের কারণে সাধারণ মানুষের বাজারের অভ্যাসে বড় পরিবর্তন এসেছে। বাজারে এখন চাল, ডাল, তেল বা শাকসবজির মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেজি বা ডজনের হিসাব ছাপিয়ে নেমে এসেছে পোয়া (২৫০ গ্রাম), হালি কিংবা নির্দিষ্ট টাকার (৫০, ১০০ বা ২০০) পরিমাণে। নিম্নবিত্তের পাশাপাশি মধ্যবিত্তেরও বড় একটি অংশ এখন এভাবেই হিসাব কষে বাজার করছেন। বাজারের এই পরিবর্তনে শুধু ক্রেতারাই নন, বিক্রি কমে যাওয়া ও খাটুনি বেড়ে যাওয়ায় চাপে পড়ছেন বিক্রেতারাও। নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতি ও আয়-ব্যয়ের চরম অসঙ্গতিতে পড়ে নিম্নবিত্ত তো বটেই, মধ্যবিত্তের বড় একটি অংশও বাজার করতে গিয়ে কেজির বা ডজনের বদলে ৫০/১০০/২০০ টাকার অঙ্কে হিসাব কষে পণ্য কিনছেন। কেউ কাঁচামরিচ কিনছেন ২০ বা ৩০ টাকার। হারুন বলেন, আগে ১০০ গ্রাম বা আড়াইশ গ্রাম মসুর ডাল কেউ চাইলে আমরা বিরক্তি প্রকাশ করতাম। দিনে কয়েকশ বার পাল্লায় ১০০-২০০ গ্রাম মাপতে গিয়ে সময় নষ্ট হয়, দোকানে ভিড় জমে কিন্তু বিক্রি বাড়ে না।
রাজধানীর মালিবাগ রেলগেট কাঁচাবাজারে জয়নুল ইসলামের মতো অনেক ক্রেতা এখন খুব হিসেব করে বাজার করেন। দোকানি খলিল পলিথিনে মেপে মেপে জিনিসগুলো দিচ্ছেন।
নিরাপত্তা প্রহরী জয়নুল জানান, মাসের শেষে বেতনের টাকা বাড়ি ভাড়া ও সন্তানের স্কুলের খরচে শেষ হয়ে যায়। পকেট থেকে টাকা বের করে জয়নুল দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘মাস শেষ হতে এখনো দশ দিন বাকি।
তাই ব্যাগভর্তি বাজার করার সাধ্য নেই। তিনি বলেন, এখন এক হালি ডিম, এক পোয়া মসুর ডাল আর সামান্য পরিমাণ পেঁয়াজ-রসুনে সীমাবদ্ধ থাকতে হচ্ছে। মগবাজারের বাসিন্দা সেলিনা আক্তার জানান, আগে মাসে দশ কেজি চাল বা দুই কেজি ডাল কিনলেও এখন প্রতিদিনের বাজার প্রতিদিন করতে হয়। পাতলা ডাল আর ডিম ভাজিতেই এখন তাদের রাতের আহার সারতে হচ্ছে। ফর্দটা বড় নয়, তবে অদ্ভুত ঠেকতে পারে আগের যেকোনো স্বাভাবিক সময়ের তুলনায়। ‘ভাই, এক হালি ডিম, এক পোয়া মসুর ডাল, আধা কেজি পেঁয়াজ আর ২/৩টা রসুন, দেন।’। রাতে কোনোমতে ফুটিয়ে পাতলা ডাল, ডিম ভাজি আর ভাত খাব।
বাজারে সবচেয়ে বেশি কাটছাঁট দেখা যাচ্ছে তেল, চিনি, মসুর ডাল, মাছ, মাংস ও কাঁচামরিচের মতো পণ্যে। আলু-পেঁয়াজের মতো নিত্যপণ্য এখন আর পাল্লায় (৫ কেজি) কেনা হচ্ছে না, বরং ক্রেতারা তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী ৫০ বা ১০০ টাকার যতটুকু পাওয়া যায় তা কিনছেন। একইভাবে ব্রয়লার মুরগির ক্ষেত্রেও আস্ত মুরগি নয়, অনেকে এখন পা, গিলা বা কলিজার মতো টুকরো মাংস কিনছেন। মাংস বিক্রেতা সবুজ খান জানান, নয়াটোলার বাজারে আগে যারা সাত কেজি মাংস কিনতেন তারা এখন তিন-চার কেজিতে নেমে এসেছেন। অনেকে এসে ৩০০ বা ৫০০ টাকার মাংস দেওয়ার অনুরোধ করেন। যারা ডিম ডজন বা এক খাঁচি (৩০ টি) করে নিতেন, তারা নেমে এসেছেন হালিতে। আমরা ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী কেজি প্রতি দাম ধরে ৩০০-৫০০ টাকার মাংস ওজন করে দেই। তিনি বলেন, পারিবারিকভাবে তারা প্রায় ৫০ বছর ধরে এ ব্যবসা করে আসছেন। গত ১৭ বছর থেকে তিনি নিজে দোকানটি পরিচালনা করছেন।
ব্যবসায়ীরা জানাচ্ছেন, খুচরো বিক্রির এই প্রবণতা তাদের জন্যও বেশ ঝক্কির। মুদি ব্যবসায়ী হারুন মিয়ার মতে, আগে দিনে যে পরিমাণ ডাল দুই-একজন ক্রেতার কাছে বিক্রি হতো, এখন সেই একই পরিমাণ বিক্রি করতে পঞ্চাশজনকে সামলাতে হয়। এতে দোকানের সময় নষ্ট হয় এবং ভিড় বাড়লেও বিক্রির লক্ষ্য পূরণ হয় না। সবজি বিক্রেতা সুজন মিয়া জানান, ক্রেতারা এখন মাত্র দুটি পটল বা একটি বেগুন কিনতে চান। এতে অবশিষ্ট সবজি শুকিয়ে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে, যার ফলে বিক্রেতারা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন। মগবাজারের নয়াটোলা এলাকার মুদি ব্যবসায়ী মো. হারুন মিয়া জানান, আগে যেখানে দিনে ১৫-২০ কেজি মসুর ডাল এক-দুই কেজি করে কয়েকজনের কাছেই বিক্রি হয়ে যেত, এখন সেই পরিমাণ ডাল বিক্রি করতে অন্তত ৫০ জন ক্রেতা সামলাতে হয়।
বিক্রেতাদের অভিযোগ, ছোট ছোট পরিমাণে পণ্য বিক্রির কারণে পলিথিন ও প্যাকেটের ব্যবহার আগের তুলনায় তিন থেকে চার গুণ বেড়েছে। এক কেজি পণ্যের প্যাকেজিং খরচের তুলনায় ছোট ছোট ভাগে বিক্রি করতে প্যাকেজিং বাবদই বাড়তি কয়েক টাকা ব্যয় হচ্ছে। এছাড়া, খুচরো কেনাকাটার ফলে ক্রেতাদের অজান্তেই খরচ বাড়ছে। অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, খুচরো বাজারে এক কেজি মসুর ডালের দাম ১৫০ টাকা হলেও ২৫০ গ্রাম কিনলে ৪০-৪৫ টাকা খরচ হয়, অর্থাৎ কেজিতে ১৬০-১৮০ টাকা পড়ে যাচ্ছে। নগদ অর্থের সংকটে পড়ে নিম্ন আয়ের মানুষ এভাবে উল্টো বাড়তি মাশুল দিচ্ছে। কোনো পণ্যের পরিমাণই কেজির ঘরে পৌঁছায়নি।
বাজার নিয়ন্ত্রণে টিসিবির ফ্যামিলি কার্ড ও ওএমএস কার্যক্রম চালু থাকলেও সরবরাহ চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত কম। টিসিবির ট্রাকের পেছনে ভোরেই শত শত মানুষের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযান চললেও পাইকারি ও খুচরা বাজারের সিন্ডিকেট ভাঙা সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, কেবল জরিমানা দিয়ে এই সংকট কাটবে না। সরবরাহ চেইন ঠিক রাখা এবং সামাজিক সুরক্ষা বেষ্টনী বা রেশনিং ব্যবস্থার আওতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।
পুষ্টিবিদরা এই অবস্থার ভয়াবহতা নিয়ে সতর্ক করেছেন। মাছ-মাংসের মতো প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার বাদ দিয়ে শুধু ডাল-ভাতের ওপর নির্ভরশীল থাকায় নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোতে দীর্ঘমেয়াদী পুষ্টিহীনতা তৈরি হচ্ছে। এই প্রয়োজনীয় পুষ্টির অভাব একটি প্রজন্মের শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতাকে খাটো করে ফেলছে। পরিস্থিতির পরিবর্তন না হলে ভবিষ্যতে স্বাস্থ্য খাতে এর চেয়েও বড় মাশুল দিতে হবে বলে তারা মনে করেন।