
রাশিয়াগামী ইরানি বাণিজ্যিক জাহাজে ইউক্রেনের হামলার জবাবে কাস্পিয়ান সাগরে উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে। এর প্রতিশোধ হিসেবে ইউক্রেনের একটি সমুদ্রবন্দরে পাল্টা হামলার কথা বিবেচনা করেছিল ইরান—সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এমন দাবি করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনাটি নির্দেশ করছে কীভাবে পূর্ব ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের দুটি ভিন্ন যুদ্ধ একে অপরের সঙ্গে মিশে গিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে তীব্র অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
ঘটনার সূত্রপাত গত শনিবার (২৫ জুলাই)। সেদিন কাস্পিয়ান সাগরে রাশিয়াগামী একটি ইরানি পণ্যবাহী জাহাজে হামলা চালায় ইউক্রেন। এতে এক ইরানি বেসামরিক নাবিক নিহত হন। গোয়েন্দা তথ্যের বরাতে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, প্রতিক্রিয়া হিসেবে তেহরান ইউক্রেনের ওপর ছোট আকারের একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বা কৃষ্ণসাগরীয় কোনো বন্দরে প্রতীকী হামলা চালানোর কথা ভাবছিল, যাতে ক্ষয়ক্ষতি কম হলেও কঠোর বার্তা দেওয়া যায়। ইরানের পক্ষ থেকে সরাসরি ইউক্রেনে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হলে তা সংঘাতকে এক অভূতপূর্ব ও বিপজ্জনক উচ্চতায় নিয়ে যেত।
তবে সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতায় উত্তেজনা কিছুটা স্তিমিত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশের পর ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহার সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন। কথোপকথনে ইউক্রেনীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, এই হামলাটি অনাকাঙ্ক্ষিত ছিল। আরাঘচি স্পষ্ট করেছেন, ইরান সংঘাত বাড়াতে চায় না, তবে দেশের নাগরিক বা স্বার্থে হামলা কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না এবং ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। একই সঙ্গে উত্তেজনা কমাতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ কূটনীতিক কাজা কাল্লাসের সঙ্গেও আলোচনা করেছেন তিনি।
এদিকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি অভিযোগ করেছেন, রাশিয়া ও ইরান সামরিক সহযোগিতার পরিধি বাড়িয়েছে। তিনি জানান, রাশিয়া মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ও উপসাগরীয় সামরিক স্থাপনার স্যাটেলাইট ছবি তুলছে এবং তা ইরানের হাতে তুলে দিচ্ছে, যা মধ্যপ্রাচ্যে হামলার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।
অন্যদিকে, বিশ্লেষকেরা ধারণা করছেন কাস্পিয়ান সাগরে ইউক্রেনের এই দূরপাল্লার ড্রোন হামলাটি যুক্তরাষ্ট্রের সবুজ সংকেত ছাড়া সম্ভব ছিল না। অনেকে মনে করছেন, ওয়াশিংটনের কাছে নিজেদের কৌশলগত গুরুত্ব প্রমাণের জন্যই কিয়েভ এই পদক্ষেপ নিয়েছে।
এই টানাপোড়েনের মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যেও সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে। জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে ছোড়া ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ব্যর্থ করার পর যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব যৌথভাবে ইরাকে ইরান সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী পিএমএফ-এর ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে। এতে অন্তত ২০ জন সেনা নিহত হয়েছে। ঘটনাটি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কূটনৈতিক সুযোগ দেওয়ার ঘোষণার পর প্রথম বড় ধরনের সামরিক পদক্ষেপ। ওয়াশিংটন স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে, মার্কিন সেনা বা আঞ্চলিক অবকাঠামোয় আঘাত এলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সব মিলিয়ে, কাস্পিয়ান সাগরের এই ঘটনা প্রমাণ করে যে মস্কো-তেহরান অক্ষ এবং কিয়েভ-ওয়াশিংটন জোটের সংঘাত এখন ভৌগোলিক সীমা ছাড়িয়ে একটি সার্বিক বৈশ্বিক যুদ্ধের রূপ নিচ্ছে।