
এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফলে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের অধীন জেলাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে মানিকগঞ্জ। পাসের হার, জিপিএ-৫ অর্জন এবং সামগ্রিক ফলাফল—সব মিলিয়ে জেলার শিক্ষার মান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। এ বছর জেলায় এইচএসসি পরীক্ষায় পাসের হার দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩৮ দশমিক ২১ শতাংশ। যেখানে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সার্বিক পাসের হার ৬১ দশমিক ৮০ শতাংশ। অর্থাৎ বোর্ডের গড় পাসের হারের চেয়ে মানিকগঞ্জ পিছিয়ে ২৩ দশমিক ৫৯ শতাংশ পয়েন্ট।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) প্রকাশিত ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের জেলাভিত্তিক ফলাফল এবং সবশেষ মানিকগঞ্জ জেলা শিক্ষা অফিসের সমন্বিত ফলাফল বিশ্লেষণ করে এ চিত্র পাওয়া গেছে।
জেলা শিক্ষা অফিসের তথ্যানুযায়ী, মানিকগঞ্জে এ বছর এইচএসসি পরীক্ষায় ৩৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ১০ হাজার ২৪৪ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেয়। তাদের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ৩ হাজার ৯১৫ জন। অকৃতকার্য হয়েছে ৬ হাজার ৩২৯ জন। পাসের হার ৩৮ দশমিক ২১ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে মাত্র ৮৭ জন।
অন্যদিকে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এ বছর মোট ২ লাখ ৯৭ হাজার ৬২১ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেয়। তাদের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ১ লাখ ৮৩ হাজার ৯৩০ জন। বোর্ডের সার্বিক পাসের হার ৬১ দশমিক ৮০ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৬ হাজার ৭১৪ জন।
বোর্ডের জেলাভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ঢাকা মহানগরীতে পাসের হার সবচেয়ে বেশি ৭৯ দশমিক ৩৩ শতাংশ। এ অঞ্চলে ৮৮ হাজার ১৫৪ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ৬৯ হাজার ৯৯৯ জন। জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৩ হাজার ৪৮২ জন।
এ ছাড়া মুন্সীগঞ্জে পাসের হার ৬৬ দশমিক ৬১ শতাংশ, নারায়ণগঞ্জে ৬১ দশমিক ৪৯, গাজীপুরে ৫৭ দশমিক ৮৫, মাদারীপুরে ৫০ দশমিক ৬২, কিশোরগঞ্জে ৫০ দশমিক ৭৪ এবং টাঙ্গাইলে ৪৯ দশমিক ৭৬ শতাংশ। নরসিংদীতে পাসের হার ৪৫ দশমিক ৭৯, গোপালগঞ্জে ৪২ দশমিক ৭৩, শরীয়তপুরে ৪১ দশমিক ৮৫, ফরিদপুরে ৪১ দশমিক ০৫ এবং রাজবাড়ীতে ৪০ দশমিক ৮২ শতাংশ। এসব জেলার মধ্যে সর্বনিম্ন পাসের হার মানিকগঞ্জে।
জিপিএ-৫ অর্জনের ক্ষেত্রেও জেলার অবস্থান হতাশাজনক। ১০ হাজারের বেশি পরীক্ষার্থী অংশ নিলেও জিপিএ-৫ পেয়েছে মাত্র ৮৭ জন। বিপরীতে ঢাকা মহানগরীতে ১৩ হাজার ৪৮২, নারায়ণগঞ্জে ৭৬১, মুন্সীগঞ্জে ৬৯১ এবং গাজীপুরে ৩৮৪ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে।
প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ফলেও ফল বিশ্লেষণেও উঠে আসে হতাশার চিত্র।
জেলা শিক্ষা অফিসের প্রকাশিত প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, শুধু সাধারণ এইচএসসি নয়, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষার ফলাফলও সন্তোষজনক নয়।
জেলার ১১টি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ১ হাজার ২০২ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ৫২৯ জন। পাসের হার ৪৪ দশমিক ০১ শতাংশ। অন্যদিকে আলিম পরীক্ষায় ৭টি মাদ্রাসার ১৯৫ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ৬৪ জন। এ ক্ষেত্রে পাসের হার ৩২ দশমিক ৮২ শতাংশ।
প্রতিষ্ঠানভিত্তিক তালিকায় কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ফলাফলও উদ্বেগজনক। কিছু প্রতিষ্ঠানে পাসের হার ২০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। কোথাও আবার পরীক্ষার্থীদের সবাই অকৃতকার্য হয়েছে। বিশেষ করে শিক্ষার্থীসংখ্যা ও পাসের হারের মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য জেলার শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতাকে সামনে এনেছে।
প্রাপ্ত ফলাফল অনুযায়ী, জেলার ঘিওর উপজেলার ড. আবদুর রহিম খান মহিলা কলেজ, মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার গোলাম মনির হোসেন গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ, দৌলতপুর উপজেলার বাঘুটিয়া আলিম মাদ্রাসা এবং সাটুরিয়া উপজেলার দরগ্রাম ফাজিল মাদ্রাসায় কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি।
এর মধ্যে ড. আবদুর রহিম খান মহিলা কলেজ থেকে একজন পরীক্ষার্থী অংশ নিলেও তিনি অকৃতকার্য হয়েছেন। গোলাম মনির হোসেন গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে সাতজন, বাঘুটিয়া আলিম মাদ্রাসা থেকে নয়জন এবং দারগ্রাম ফাজিল মাদ্রাসা থেকে ১৭ জন পরীক্ষায় অংশ নেন। চার প্রতিষ্ঠানের সব পরীক্ষার্থীই ফেল করেছেন।
কেন এমন ফল, প্রশ্ন উঠেছে জেলার শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে?
শিক্ষার মান, শ্রেণিকক্ষে পাঠদান, শিক্ষকদের জবাবদিহি, নিয়মিত মূল্যায়ন, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সার্বিক ব্যবস্থাপনা—এসব বিষয় নিয়ে নতুন করে আলোচনার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
কারিগরি ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান প্রধান হিসেবে জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনকারী প্রকৌশলী ড. মোহাম্মদ ফারুক হোসেন বলেন,
“বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠানে পাসের হার অত্যন্ত কম কিংবা কোনো শিক্ষার্থীই উত্তীর্ণ হতে পারেনি, সেসব প্রতিষ্ঠানের পাঠদান কার্যক্রম, শিক্ষক উপস্থিতি, বিষয়ভিত্তিক ফলাফল ও প্রশাসনিক তদারকি নিয়ে অনুসন্ধান প্রয়োজন।”
সুশাসনের জন্য নাগরিক ( সুজন) মানিকগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতি ও সরকারি দেবেন্দ্র কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ প্রফেসর ইন্তাজ উদ্দিন বলেন, “ঢাকা বোর্ডের জেলাভিত্তিক ফলাফলে মানিকগঞ্জের এই অবস্থান কেবল একটি পরীক্ষার ফলাফল নয়; এটি জেলার শিক্ষার সার্বিক মান নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে। এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রশাসন এই ফলাফল থেকে শিক্ষা নিয়ে শিক্ষার মানোন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগ নেয় কি না।”
এ বিষয়ে মানিকগঞ্জ জেলা শিক্ষা অফিসার মোঃ আমীর হোসেন বলেন ,”ফলাফলের উন্নয়ন ঘটাতে সার্বক্ষণিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো তদারকি করা দরকার। আমরাও কাজ করে যাচ্ছি কিন্তু একার পক্ষে সব করা সম্ভব না। প্রতিষ্ঠান প্রধান ও শিক্ষকদের পাশাপাশি অভিভাবকদেরও সচেতন হতে হবে। গুণগত মান সম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে ক্লাস রুম হতে হবে ইন্টারেস্টিং। যাতে শিক্ষার্থীরা ক্লাসে আসতে আগ্রহী হয়।”
একই শিক্ষা বোর্ডের অধীনে অন্য জেলাগুলোর তুলনায় মানিকগঞ্জের এমন পিছিয়ে পড়ার কারণ কী, তা খতিয়ে দেখা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। শুধু পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর পর্যালোচনা নয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক দুর্বলতা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি উঠেছে।