
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের নিরাপত্তা রক্ষায় পাকিস্তানের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। রিয়াদের সুরক্ষায় পাকিস্তান কত দূর পর্যন্ত সহায়তা দেবে এবং হুথিদের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে তারা সরাসরি কোনো সামরিক অভিযানে নামবে কি না, তা নিয়ে কূটনৈতিক ও সামরিক মহলে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। দ্য ডিপ্লোম্যাটের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে, সৌদি আরবের প্রতি নিরাপত্তার অঙ্গীকার থাকলেও ইসলামাবাদ আপাতত সরাসরি স্থলযুদ্ধে জড়ানোর পরিবর্তে সহায়ক অবস্থানে থাকার কৌশলই বেছে নিয়েছে।
পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে প্রতিরক্ষা সম্পর্কের ইতিহাস বেশ পুরনো।
সেই ১৯৬০-এর দশক থেকেই পাকিস্তানি কর্মকর্তারা সৌদি সামরিক বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে আসছেন।
পরবর্তীতে ১৯৮২ সালে উভয় দেশের মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতার বিষয়টি আনুষ্ঠানিক রূপ পায়। এমনকি উপসাগরীয় যুদ্ধের সময়ও সৌদি আরবের নিরাপত্তায় পাকিস্তানি সেনা মোতায়েন করা হয়েছিল। তবে সব ক্ষেত্রে পাকিস্তান সৌদি আরবের সাথে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেওয়ার নীতি অনুসরণ করেনি। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৫ সালে ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের সামরিক অভিযানে যোগ দেওয়ার বিষয়টি পাকিস্তানের পার্লামেন্টে তোলা হলে তা সরাসরি নাকচ হয়ে যায় এবং পাকিস্তান নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখে। সেই সময় পাকিস্তানি সেনার ভূমিকা কেবল প্রশিক্ষণ ও প্রতিরক্ষামূলক পরামর্শের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে ‘কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি’ বা এসএমডিএ স্বাক্ষরের পর দুই দেশের নিরাপত্তা সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের আগস্ট মাসে তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে মক্কা চুক্তি সম্পন্ন হয়, যা আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা সমীকরণে বড় ধরণের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। দ্য ডিপ্লোম্যাটের তথ্য অনুযায়ী, গত ৫ অক্টোবর পাকিস্তান ও তুরস্ক সৌদি আরবের সঙ্গে বর্ধিত নিরাপত্তা সহযোগিতার বিষয়ে সম্মতি প্রকাশ করে, যার মূল কারণ ছিল হুথিদের ক্রমবর্ধমান হামলা।
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ স্পষ্ট করেছেন যে, পাকিস্তান ও তুরস্ক এই মুহূর্তে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। তিনি জানান, গোয়েন্দা নজরদারি এবং অন্যান্য কৌশলগত সহায়তা দিলেও সরাসরি যুদ্ধের ময়দানে লড়াই করছে মূলত সৌদি বাহিনীই। এর পেছনে পাকিস্তানের কৌশলগত সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। প্রথমত, ইরানের সঙ্গে পাকিস্তানের প্রায় ৯০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। এছাড়া, হুথিদের সঙ্গে ইরানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে সৌদি নেতৃত্বাধীন কোনো বড় অভিযানে সরাসরি অংশগ্রহণ তেহরানের সঙ্গে পাকিস্তানের বিদ্যমান সম্পর্ককে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
অভ্যন্তরীণ নানা সমীকরণও এক্ষেত্রে বড় প্রভাবক। পাকিস্তানের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ শিয়া মুসলিম হওয়ার কারণে ইরানবিরোধী কোনো সামরিক অবস্থানে গেলে দেশটির অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি আফগানিস্তান ও ভারতের সীমান্তে চলমান নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ সামলাতে হিমশিম খেতে হয় পাকিস্তানকে, ফলে মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে জড়ানো ইসলামাবাদের জন্য বাড়তি চাপের কারণ হতে পারে।
তবে অর্থনৈতিক দিকটিও উপেক্ষা করার মতো নয়। সৌদি আরবের আর্থিক বিনিয়োগ ও সহায়তা পাকিস্তানের অর্থনীতি সচল রাখার জন্য অত্যন্ত জরুরি, যা রিয়াদের নিরাপত্তা চাহিদা পূরণে ইসলামাবাদকে মানসিকভাবে বাধ্য করে। অবশ্য বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সৌদি আরবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা থাকলেও ভবিষ্যতে ভারতের সঙ্গে কোনো সংঘাতময় পরিস্থিতিতে রিয়াদ পাকিস্তানকে একই মাত্রায় কূটনৈতিক বা সামরিক সমর্থন দেবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। সব মিলিয়ে, প্রতিরক্ষা চুক্তির বাধ্যবাধকতা, নিজস্ব অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখেই ইসলামাবাদকে সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে, যা বর্তমান পরিস্থিতিতে অত্যন্ত জটিল।