
২০১১ সালে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় (ববি) প্রতিষ্ঠার পর পেরিয়েছে প্রায় দেড় দশক। এরই মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে একাধিক ব্যাচ স্নাতক সম্পন্ন করে কর্মজীবনে প্রবেশ করেছে, কেউ উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমিয়েছেন বিদেশে। কিন্তু শিক্ষাজীবনের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন ‘সমাবর্তন’ নিয়ে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীদের অপেক্ষার যেন শেষ নেই।
বিগত বছরের বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে একাধিকবার প্রথম সমাবর্তন আয়োজনের উদ্যোগ ও আশ্বাস দেওয়া হলেও দীর্ঘদিন তা বাস্তবে রূপ নেয়নি। সর্বশেষ ২০২৫ সালের শেষ দিকে ২০২৬ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি প্রথম সমাবর্তনের সম্ভাব্য তারিখ নির্ধারণ করে ছয় সদস্যের একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছিল। তবে ২২ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত ওই তারিখে সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হওয়ার নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি।
শুরু থেকেই ছিল সমাবর্তনের প্রতিশ্রুতি
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের বয়স যখন মাত্র সাত বছর, তখনও প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রথম সমাবর্তন আয়োজনের পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছিল। ২০১৮ সালের একটি প্রতিবেদনে তৎকালীন উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা উন্নয়ন পরিকল্পনার পাশাপাশি প্রথম সমাবর্তন আয়োজনের ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠার কয়েক বছর পর থেকেই সমাবর্তন নিয়ে আলোচনা থাকলেও তা আয়োজনের পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
এরপর ২০২২ সালে সমাবর্তন নিয়ে আবারও উদ্যোগের খবর সামনে আসে। ওই বছরের ২১ জুন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং প্রথম সমাবর্তনে রাষ্ট্রপতির অংশগ্রহণের বিষয়টি সামনে আসে।
২০২৪: ‘চলতি বছরেই’ সমাবর্তনের ঘোষণা
দীর্ঘ অপেক্ষার পর ২০২৪ সালের শুরুতে সমাবর্তন নিয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আরও স্পষ্ট ঘোষণা আসে। জানুয়ারি ২০২৪-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই বছরের মধ্যেই সমাবর্তন আয়োজনের আশ্বাস দিয়েছিলেন তৎকালীন রুটিন উপাচার্য। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, ততদিনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছয় হাজারের বেশি শিক্ষার্থী স্নাতক সম্পন্ন করেছেন।
এরপর ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়া রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে প্রথম সমাবর্তনে অংশ নেওয়ার জন্য তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানান। রাষ্ট্রপতিও এতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। সে সময় উপাচার্য জানিয়েছিলেন, ২০১১ সালে প্রতিষ্ঠার পর বিশ্ববিদ্যালয়ে তখনও কোনো সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়নি এবং ওই বছরই প্রথম সমাবর্তনের প্রস্তুতি চলছিল।কিন্তু ঘোষিত সময়ের মধ্যে সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়নি।
২০২৫: ১৩ ব্যাচ পেরিয়েও অপেক্ষা
২০২৫ সালের মে মাসে প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদনে উঠে আসে সমাবর্তন না হওয়ার বিষয়টি। একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১১ সালে প্রতিষ্ঠার পর ১৩টি ব্যাচের ক্লাস শুরু হলেও আটটি ব্যাচ ইতোমধ্যে স্নাতক সম্পন্ন করেছে; তারপরও বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি সমাবর্তনও অনুষ্ঠিত হয়নি।
অন্য এক প্রতিবেদনে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ১৪ হাজার সাবেক শিক্ষার্থী সমাবর্তনের অপেক্ষায় রয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, আগের বছর রাষ্ট্রপতিকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও এরপর আর দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়নি।
সমাবর্তন না হওয়ায় শুধু আনুষ্ঠানিকতার অপূর্ণতাই নয়, সাবেক শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ মূল সনদ না পাওয়ার কারণে চাকরি ও উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও সমস্যার কথা জানিয়েছেন। ২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদনে ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের এক সাবেক শিক্ষার্থী মূল সনদের অভাবে চাকরি ও উচ্চশিক্ষায় জটিলতার কথা তুলে ধরেন।
আবারও উদ্যোগ, নির্ধারিত হয় সম্ভাব্য তারিখ
দীর্ঘ অপেক্ষার পর ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রথম সমাবর্তন আয়োজনের আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতির খবর আসে। ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-কে সম্ভাব্য তারিখ ধরে ছয় সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির দায়িত্ব ছিল সমাবর্তন আয়োজনের পূর্ণাঙ্গ কর্মপরিকল্পনা বা ‘Convocation Framework’ তৈরি করা।
কিন্তু ২০২৬ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি পার হয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হওয়ার বিষয়ে নির্ভরযোগ্য সংবাদ প্রতিবেদন পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে একাধিকবার উদ্যোগ ও আশ্বাসের পরও কেন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সমাবর্তন বাস্তবায়িত হচ্ছে না?
শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন, দায় কার?
সমাবর্তন কেবল গাউন পরা কিংবা আনুষ্ঠানিকভাবে সনদ গ্রহণের অনুষ্ঠান নয়। একজন শিক্ষার্থীর দীর্ঘ একাডেমিক জীবনের সমাপ্তি ও অর্জনের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির সঙ্গে এটি জড়িত। তাই বছরের পর বছর সমাবর্তনের অপেক্ষায় থাকা সাবেক শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হওয়াটা স্বাভাবিক।
বিশেষ করে ২০১১ সালে যাত্রা শুরু করা একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় যখন ইতোমধ্যে একাধিক ব্যাচকে স্নাতক সম্পন্ন করিয়েছে, তখনও প্রথম সমাবর্তনের জন্য শিক্ষার্থীদের অপেক্ষা করতে হওয়া প্রশাসনিক সক্ষমতা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।
২০১৮ সালের পরিকল্পনা থেকে ২০২২ সালের রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ, ২০২৪ সালের ‘চলতি বছরেই’ সমাবর্তনের আশ্বাস, ২০২৫ সালের ক্ষোভ-হতাশা এবং সর্বশেষ ২০২৬ সালের সম্ভাব্য তারিখ প্রায় এক দশকজুড়ে একই বিষয়ের পুনরাবৃত্তি দেখা যায়।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রাক্তন শিক্ষার্থী রবিউল ইসলাম বলেন, চারটি বছর, অসংখ্য স্মৃতি ও স্বপ্ন নিয়ে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়েছিলাম, স্বপ্ন ছিল একদিন কালো গাউন পরে ফিরবো।ইতোমধ্যে ৯টি ব্যাচ বের হয়ে গেলেও সেই স্বপ্ন আজও অপূর্ণ।অনেক মা-বাবা সন্তানের সমাবর্তনের গর্বের মুহূর্ত দেখার সুযোগও হারিয়েছেন।সমাবর্তন শুধু অনুষ্ঠান নয়, এটি শিক্ষাজীবনের অর্জন ও ত্যাগের স্বীকৃতি।তাই আর নয় অপেক্ষা দ্রুত বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সমাবর্তন আয়োজনের দাবি জানাই।
এ বিষয়ে ববি রেজিষ্ট্রার ড.আব্দুল আলিম বাছির বলেন,কনভোকেশন প্রতিবছর হওয়া উচিত কিন্তু বাংলাদেশের কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন কারণে ইয়ারলি বেসিসে কনভোকেশন হয় না। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান প্রশাসন এ বিষয়ে অত্যন্ত সচেতন। প্রথম কনভেনশনটা যাতে অতি দ্রুত হয় সে বিষয়ে এ প্রশাসন সচেতন। এ বিষয়ে আপনারা খুব শীগ্রই আপডেট পাবেন।
এ বিষয়ে ববি ভিসি যেনো দিলেন রেজিস্ট্রার এর বিপরীত বার্তা, ববি উপাচার্য অধ্যাপক ড. মামুন অর রশিদ বলেন, আমরা এখনো সমাবর্তন নিয়ে কিছু চিন্তা করি নি।আমাদের প্লান অন ওয়ার্ক আছে, সেখানে আমরা কিছু ডেভেলপমেন্ট, কিছু ব্যাসিক রিফর্ম এর কথা চিন্তা করতে ছি ইনশাআল্লাহ সেগুলো করে আমরা পরবর্তীতে সমাবর্তন এর দিকে যাবো। সমাবর্তন করতে গেলে ক্যাম্পাস টা একটু পরিপাটি হওয়া দরকার কিন্তু বর্তমানে ক্যাম্পাসে সমাবর্তন করাটা আমার মনে হয় ডিফিকাল্ট। সব কিছু ঠিক করে তারপর ইনশাআল্লাহ আমরা সমাবর্তনের দিকে আগাবো।আমাদের পরিকল্পনায় সমাবর্তন নেই। জানুয়ারিতে গিয়ে আমরা চিন্তা করবো কখন সমাবর্তন করা যায়।