
কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দারিদ্র্য হ্রাসের লক্ষ্য ছিল। সেই উদ্দেশ্যে কুড়িগ্রামের উলিপুর, চিলমারী, রাজারহাট ও নাগেশ্বরী উপজেলায় প্রায় ২৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছে চারটি কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ কেন্দ্র। কিন্তু নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার প্রায় চার বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো চালু হয়নি একটিও।
দীর্ঘদিন ধরে তালাবদ্ধ পড়ে থাকায় কেন্দ্রগুলোর ভেতরে থাকা কোটি কোটি টাকার মূল্যবান যন্ত্রপাতি নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অথচ এসব কেন্দ্র চালু হলে প্রতিটি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার মাধ্যমে ২০ থেকে ২৫ জনের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির কথা ছিল। কবে নাগাদ কেন্দ্রগুলো চালু হবে, তারও সুনির্দিষ্ট দিনক্ষণ জানাতে পারেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
বিশেষ অনুসন্ধানে জানা গেছে, কুড়িগ্রাম জেলার ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্য হ্রাসকরণ প্রকল্পের আওতায় ২০১৮ সালে বগুড়া পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (আরডিএ) জেলার চার উপজেলায় কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের আর্থিক সহায়তায় ২০২২-২৩ অর্থবছরে উলিপুর, চিলমারী, রাজারহাট ও নাগেশ্বরীতে কেন্দ্রগুলোর অবকাঠামো নির্মাণ শেষ হয়।
জমি ক্রয় ও ভবন নির্মাণসহ চারটি কেন্দ্রে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২৪ কোটি টাকা। পরবর্তীতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রগুলোতে প্রয়োজনীয় উৎপাদনমুখী যন্ত্রপাতি স্থাপন করে বগুড়া আরডিএর কাছে হস্তান্তর করে। পরে সেগুলো রংপুর পল্লী উন্নয়ন একাডেমির কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপর থেকে কেন্দ্রগুলো রংপুর পল্লী উন্নয়ন একাডেমির তত্ত্বাবধানে রয়েছে।
কিন্তু নির্মাণ ও যন্ত্রপাতি স্থাপনের পর থেকেই কার্যত তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছে কেন্দ্রগুলো। বর্তমানে প্রতিটি কেন্দ্রে চুক্তিভিত্তিক দুজন করে পাহারাদার দায়িত্ব পালন করছেন।
তালা ঝুলছে কোটি টাকার যন্ত্রপাতিতে
সরেজমিনে দেখা গেছে, চারটি কেন্দ্রের মূল ফটকে বড় তালা ঝুলছে। ভেতরে চুক্তিভিত্তিক পাহারাদাররা দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের একজন রোকন মিয়া ও মশিউর জানান, কেন্দ্র পাহারা দেওয়াই তাদের প্রধান দায়িত্ব। কেন্দ্রের কার্যক্রম কবে শুরু হবে কিংবা কীভাবে পরিচালিত হবে, সে বিষয়ে তাদের কাছে বিস্তারিত কোনো তথ্য নেই।
অথচ কেন্দ্রগুলোতে স্থাপন করা হয়েছে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের আধুনিক নানা যন্ত্রপাতি। রয়েছে ধান, গম, সরিষা, সূর্যমুখী ও তিল ভাঙানোর মেশিন। রয়েছে বেকারি পণ্য তৈরির লাইন, চিপস তৈরির মেশিন, টমেটো সস, আম ও আনারসের পাল্প ও জুস তৈরির মেশিন, ক্যান্ডি তৈরির মেশিন, মসলা প্রক্রিয়াজাত ও গুঁড়া করার মেশিন এবং দই তৈরির ইনকিউবেটর।
এ ছাড়া চিপস, সস, তরল ও পাউডারজাতীয় পণ্য প্যাকিংয়ের মেশিন, তিনটি কোল্ডরুম—দুটি ফল ও সবজির জন্য এবং একটি মাছ ও মাংস সংরক্ষণের জন্য—এবং পণ্যের গুণগত মান পরীক্ষার যন্ত্রপাতিও রয়েছে।
প্রতিটি কেন্দ্রে রয়েছে বৈদ্যুতিক সাবস্টেশন, সোলার ব্যবস্থা, উঁচু সীমানাপ্রাচীর ও সিসিটিভি ক্যামেরা। ৫০ শতকের বেশি জমির ওপর নির্মিত এসব স্থাপনায় ছোট-বড় মিলিয়ে রয়েছে ১২টি কক্ষ।
উদ্যোক্তা তৈরির লক্ষ্য, বাস্তবে তালাবদ্ধ
আরডিএ সূত্র জানায়, একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা যাতে একটি কেন্দ্র থেকে বিভিন্ন ধরনের সুবিধা নিয়ে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত ও বাজারজাত করতে পারেন, সেভাবেই কেন্দ্রগুলো সাজানো হয়েছে। কোনো উদ্যোক্তা কেন্দ্র ব্যবহার করে উৎপাদন শুরু করলে তার মাধ্যমে সরাসরি ২০ থেকে ২৫ জনের কর্মসংস্থান হতে পারে।
কেন্দ্রগুলো লিজ দেওয়ার জন্য রংপুর পল্লী উন্নয়ন একাডেমির মহাপরিচালকের সভাপতিত্বে ১৪ সদস্যের একটি জেলা উপদেষ্টা কমিটিও গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, কৃষি সম্প্রসারণ, প্রাণিসম্পদ, সমবায় ও বিআরডিবিসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তারা রয়েছেন।
সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের মাধ্যমে সমবায়ভিত্তিক সমিতি, এনজিও কিংবা আগ্রহী ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের কাছে কেন্দ্রগুলো লিজ দেওয়ার কথা রয়েছে।
কৃষকের উৎপাদন, কিন্তু মূল্য সংযোজনের সুযোগ নেই
কুড়িগ্রাম দেশের অন্যতম কৃষিপ্রধান জেলা। জেলার উলিপুর, চিলমারী, রাজারহাট ও নাগেশ্বরীসহ বিভিন্ন উপজেলায় বিপুল পরিমাণ ধান, গম, তেলবীজ, সবজি ও ফলমূল উৎপাদিত হয়। স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, এসব কৃষিপণ্য কাঁচা অবস্থায় বিক্রি করায় অনেক সময় তারা কাঙ্ক্ষিত দাম পান না।
কেন্দ্রগুলো চালু হলে উৎপাদিত কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত, সংরক্ষণ ও প্যাকেটজাত করে বাজারজাত করার সুযোগ তৈরি হবে। এতে কৃষিপণ্যে মূল্য সংযোজনের পাশাপাশি কৃষক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারেন।
স্থানীয়দের প্রশ্ন—কৃষকের ভাগ্য বদলানো ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্দেশ্যে প্রায় ২৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত স্থাপনাগুলো যদি বছরের পর বছর তালাবদ্ধই থাকে, তাহলে সরকারি এই বিনিয়োগের সুফল মিলবে কবে?
‘খুব শিগগিরই লিজ দেওয়া হবে’
বগুড়া পল্লী উন্নয়ন একাডেমির পরিচালক মো. খালিদ আওরংগজেব বলেন, কেন্দ্রগুলোতে ছোট-বড় ১২টি কক্ষ রয়েছে এবং বিভিন্ন ধরনের কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হয়েছে। নির্মাণকাজ শেষ হলেও নানা কারণে কেন্দ্রগুলো চালু করা সম্ভব হয়নি।
রংপুর পল্লী উন্নয়ন একাডেমির পরিচালক (উপসচিব), প্রশিক্ষণ ও অর্থ মো. জাহেদুল হক চৌধুরী বলেন, প্রতিটি কেন্দ্র ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের মধ্যে লিজ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। খুব শিগগিরই এগুলো লিজ দেওয়া হবে।
তিনি জানান, কেন্দ্রগুলোতে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ থেকে শুরু করে প্যাকিং, কোল্ডস্টোরেজ ও পণ্যের মান পরীক্ষার বিভিন্ন সুবিধা রয়েছে। এসব সুবিধা কাজে লাগিয়ে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তুলতে পারবেন।
তবে প্রায় চার বছর ধরে অব্যবহৃত থাকা কেন্দ্রগুলো ঠিক কবে নাগাদ পূর্ণাঙ্গভাবে উৎপাদনে যাবে, সে বিষয়ে এখনো সুনির্দিষ্ট সময়সীমা পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত লিজ প্রক্রিয়া শেষ করে কেন্দ্রগুলো চালু করা হোক। এতে একদিকে সরকারি বিনিয়োগের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে কৃষক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য তৈরি হবে নতুন কর্মসংস্থান ও বাজারজাতকরণের সুযোগ।