
কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র। অথচ টানা দুই বছর ধরে সেখানে নেই চিকিৎসক, নেই নিয়মিত স্বাস্থ্যকর্মী, নেই ওষুধ—চিকিৎসাসেবাও পুরোপুরি বন্ধ। ফলে কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার যাদুরচর ইউনিয়নের প্রায় ৬০ হাজার মানুষ কার্যত রাষ্ট্রের মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত। সামান্য জ্বর-সর্দি থেকে শুরু করে জরুরি চিকিৎসার জন্যও তাদের ছুটতে হচ্ছে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। এতে সময় ও অর্থের অপচয়ের পাশাপাশি বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকিও।
মঙ্গলবার (২১ জুলাই) সরেজমিনে যাদুরচর ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, ভবনটি দাঁড়িয়ে থাকলেও নেই চিকিৎসাসেবার কোনো চিহ্ন। কক্ষগুলো ফাঁকা, রোগীদের জন্য নেই কোনো সেবা, দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ ওষুধ সরবরাহ। স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি যেন পরিত্যক্ত একটি সরকারি স্থাপনায় পরিণত হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় দুই বছর ধরে এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কোনো চিকিৎসক দায়িত্ব পালন করছেন না। কর্মরত ফার্মাসিস্ট আতিক মাসুদের নিয়মিত দায়িত্ব পালনের কথা থাকলেও তিনি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বসেন না। সরকারি কোয়ার্টারে অবস্থান করলেও স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমে তার কোনো ভূমিকা নেই বলেও অভিযোগ করেছেন এলাকাবাসী।
স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি অচল হয়ে পড়ায় ইউনিয়নের প্রায় ৫৫ থেকে ৬০ হাজার মানুষকে চিকিৎসার জন্য উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যেতে হচ্ছে। এতে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়ছেন গর্ভবতী নারী, শিশু, বয়স্ক ও জরুরি রোগীরা। অনেক ক্ষেত্রে সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়ায় রোগীর অবস্থা আরও জটিল হয়ে পড়ছে বলেও জানান স্থানীয়রা।
স্থানীয় বাসিন্দা মনছুর আলী বলেন, “আগে সপ্তাহে চার-পাঁচ দিন চিকিৎসাসেবা পেতাম। এখন প্রায় দুই বছর ধরে কেন্দ্রটি বন্ধ। সামান্য অসুস্থ হলেও বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে হয়, না হলে উপজেলা হাসপাতালে যেতে হয়। আমাদের ভোগান্তির যেন শেষ নেই।”
ভুক্তভোগী আছিয়া খাতুন বলেন, “গর্ভবতী নারী ও শিশুদের নিয়ে সবচেয়ে বেশি কষ্ট করতে হয়। অসুস্থ মা ও শিশুকে নিয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যেতে হয়। অনেক সময় যানবাহনও পাওয়া যায় না।”
যাদুরচর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. সরবেশ আলী বলেন, “আমার ইউনিয়নে প্রায় ৫৫ থেকে ৬০ হাজার মানুষের বসবাস। দুই বছর ধরে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি কার্যত বন্ধ। উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগকে বারবার জানিয়েছি, কিন্তু কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। দ্রুত চিকিৎসাসেবা চালুর দাবি জানাচ্ছি।”
রৌমারী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আব্দুস সামাদ বলেন, “জনবল সংকটের কারণে আপাতত চিকিৎসাসেবা বন্ধ রয়েছে। প্রয়োজনীয় জনবল পাওয়া গেলে দ্রুত স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি চালু করা হবে।”
রৌমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আলাউদ্দিন বলেন, “স্বাস্থ্যসেবা মানুষের মৌলিক অধিকার। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে এনে দ্রুত সমাধানের চেষ্টা করা হবে।”
এ বিষয়ে কুড়িগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. স্বপন কুমার বিশ্বাসের বক্তব্য জানতে একাধিকবার তার মোবাইল ফোনে কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
দুই বছর ধরে একটি সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র অচল থাকায় ক্ষোভে ফুঁসছেন স্থানীয়রা। তাদের প্রশ্ন, সরকারি অর্থে নির্মিত স্বাস্থ্যকেন্দ্র যদি বছরের পর বছর বন্ধই থাকে, তবে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করবে কে? এলাকাবাসীর দাবি, অবিলম্বে চিকিৎসক নিয়োগ, স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়মিত উপস্থিতি এবং ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করে যাদুরচর ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্রটি চালু করা হোক। অন্যথায় চিকিৎসাবঞ্চিত হাজারো মানুষের দুর্ভোগ আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।