
থাইল্যান্ডে একের পর এক বন্দুক হামলার ঘটনায় আবারও প্রশ্নের মুখে পড়েছে দেশটির নিরাপত্তাব্যবস্থা। স্কুল, শপিংমল, বাজার থেকে শুরু করে জনবহুল বিভিন্ন স্থানে গত কয়েক বছরে সংঘটিত রক্তক্ষয়ী হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন বহু মানুষ। সর্বশেষ ব্যাংককের উপকণ্ঠের একটি স্কুলে ১৪ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থীর এলোপাতাড়ি গুলিতে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীসহ অন্তত সাতজন নিহত হয়েছেন। পরে হামলাকারী কিশোর নিজেও আত্মহত্যা করায় মোট নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে সাতজনে। আহত হয়েছেন আরও অন্তত ১৫ জন।
শুক্রবার ৭ আগস্ট থাইল্যান্ডের নন্তাবুরি প্রদেশের ব্যাং ক্রুয়াই জেলার দেবসিরিন নন্তাবুরি স্কুলে স্থানীয় সময় সকালে এ হামলার ঘটনা ঘটে। ঘটনার পরপরই পুরো স্কুল ও আশপাশের এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
হামলার ভয়াবহতার বর্ণনা দিতে গিয়ে স্কুলটির ১৮ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থী বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানায়, প্রথমে সে গুলির শব্দ বুঝতে পারেনি। আতশবাজি বা পটকা ফোটার শব্দ মনে হয়েছিল তার। পরে একের পর এক গুলির শব্দ শুনতে পায় সে। কিছুক্ষণ নীরবতার পর আবারও গুলির শব্দ শুরু হয়।
ঘটনার পর দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় উদ্ধারকারী দল ও অ্যাম্বুলেন্স। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ছবি ও উদ্ধারকর্মীদের প্রকাশিত দৃশ্যে আতঙ্কিত শিক্ষার্থীদের স্কুল ভবন থেকে বেরিয়ে আসতে দেখা যায়। আহত ব্যক্তিদের অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
স্থানীয় জেলা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ শিক্ষাবর্ষে দেবসিরিন নন্তাবুরি স্কুলে প্রায় ৩ হাজার ১০০ শিক্ষার্থী ও ১৪৭ জন শিক্ষক ছিলেন।
সর্বশেষ এই হামলার পর থাইল্যান্ডে আগ্নেয়াস্ত্রের সহজলভ্যতা এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোর বন্দুক হামলার ঘটনাগুলো নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
কেন বারবার বন্দুক হামলা
থাইল্যান্ডে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ন্ত্রণে আইন থাকলেও অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার এবং আগ্নেয়াস্ত্রের সহজলভ্যতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে। পারিবারিক বিরোধ, সম্পত্তি নিয়ে দ্বন্দ্ব, ব্যক্তিগত ক্ষোভ এবং মানসিক ও আর্থিক সংকট বিভিন্ন হামলার পেছনে ভূমিকা রেখেছে বলে এসব ঘটনায় উঠে এসেছে।
গত কয়েক বছরে দেশটিতে ঘটে যাওয়া কয়েকটি বড় বন্দুক হামলা সেই উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
ফেব্রুয়ারি ২০২৬
দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর হাটাইয়ের একটি স্কুলে এক বন্দুকধারী এলোপাতাড়ি গুলি চালালে এক নারী শিক্ষক নিহত হন। হামলায় এক শিক্ষার্থীও গুরুতর আহত হয়।
জুলাই ২০২৫
ব্যাংককের একটি স্থানীয় বাজারে এক বন্দুকধারীর গুলিতে নিরাপত্তারক্ষী ও বিক্রেতাসহ পাঁচজন নিহত হন। পরে হামলাকারী নিজেও আত্মহত্যা করেন।
অক্টোবর ২০২৩
ব্যাংককের অভিজাত সিয়াম প্যারাগন শপিং সেন্টারে ১৪ বছর বয়সী এক কিশোর গুলি চালায়। এতে দুজন নিহত ও পাঁচজন গুরুতর আহত হন। পুলিশ জানিয়েছিল, ব্যবহৃত অস্ত্রটি ইন্টারনেট থেকে কেনা হয়েছিল এবং সেটি একটি ব্ল্যাঙ্ক ফায়ারিং পিস্তলকে পরিবর্তন করে তৈরি করা হয়েছিল।
অক্টোবর ২০২২
দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় নোং বুয়া লাম ফু প্রদেশে এক সাবেক পুলিশ সদস্যের ভয়াবহ হামলায় ৩৬ জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ২২ জনই ছিল ডে-কেয়ার সেন্টারে ঘুমিয়ে থাকা শিশু। প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে বন্দুক ও ছুরি নিয়ে তাণ্ডব চালানোর পর ওই ব্যক্তি তাঁর স্ত্রী, সন্তান ও নিজেকে গুলি করে আত্মহত্যা করেন।
তদন্তে জানা যায়, মাদকের অভিযোগে চাকরি হারানো ওই সাবেক পুলিশ সদস্য পারিবারিক ও আর্থিক সংকটেও ভুগছিলেন।
ফেব্রুয়ারি ২০২০
জমি ও আবাসন ব্যবসা নিয়ে বিরোধের জেরে নাখোন রাতচাসিমা শহরে এক সেনাসদস্য ভয়াবহ বন্দুক হামলা চালান। সেনা ঘাঁটি থেকে চুরি করা অ্যাসল্ট রাইফেল ও গোলাবারুদ নিয়ে তিনি অন্তত ২৯ জনকে হত্যা এবং ৫৭ জনকে আহত করেন। নিহতদের বেশিরভাগই ছিলেন একটি শপিং মলের ভেতরে। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে ওই হামলাকারী নিহত হন।
একই মাসে ব্যাংককের একটি শপিং মলের বিউটি ক্লিনিকে ঢুকে এক ব্যক্তি তাঁর সাবেক স্ত্রীকে গুলি করে হত্যা করেন। এ ঘটনায় এক পথচারীও গুলিবিদ্ধ হন।
সাম্প্রতিক হামলাগুলোর ধারাবাহিকতায় এবার স্কুলে ১৪ বছর বয়সী শিক্ষার্থীর গুলিতে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার ঘটনা দেশটির শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
থাইল্যান্ডে আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হলেও একের পর এক প্রাণঘাতী হামলা দেখিয়ে দিচ্ছে, অবৈধ অস্ত্রের প্রবেশ এবং ব্যক্তিগত বিরোধে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের ঝুঁকি এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে।
সূত্র: রয়টার্স, বিবিসি