
কুড়িগ্রামে টানা কয়েক দিনের বন্যার পর সব নদ-নদীর পানি কমতে শুরু করায় স্বস্তি ফিরতে শুরু করেছে। তবে স্বস্তির মধ্যেই নতুন শঙ্কা—দুধকুমার নদের পানি এখনও বিপৎসীমার ওপরে এবং আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে জেলার নিম্নাঞ্চলে আবারও স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বন্যার পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।
মঙ্গলবার (৩০ জুন) দুপুর ৩টায় পাউবোর নিয়ন্ত্রণ কক্ষের তথ্যমতে, দুধকুমার নদের পানি পাটেশ্বরী পয়েন্টে বিপৎসীমার ১১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। একই সঙ্গে ধরলা, তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্র নদের পানিও কমতে শুরু করেছে। তিন দিন পর ব্রহ্মপুত্রের সব পর্যবেক্ষণ পয়েন্টে পানি কমায় জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির উন্নতির আভাস মিলেছে।
তবে পানি কমলেও দুর্ভোগ কাটেনি। দুধকুমারের পানি বৃদ্ধিতে নাগেশ্বরী উপজেলার বামনডাঙা ও রায়গঞ্জ ইউনিয়নের ফান্দেরচর এলাকার অন্তত ৩০ থেকে ৪০টি পরিবারের বসতভিটা প্লাবিত হয়। মঙ্গলবার সকাল থেকে বসতভিটার পানি নামতে শুরু করলেও চারপাশে পানি থাকায় এখনো স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।
বামনডাঙা ইউনিয়নের মালিয়ানিরপার এলাকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের অসমাপ্ত প্রায় ৩০০ মিটার অংশ দিয়ে পানি প্রবেশ করে তীরবর্তী কৃষিজমি প্লাবিত হয়েছে। পাউবো জানিয়েছে, স্থানীয়দের বাধা ও ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতার কারণে ওই অংশের কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি। ফলে জিও ব্যাগের স্তূপ উপচে পানি কৃষিজমিতে ঢুকে পড়ে।
ওই ইউনিয়নের মুরিয়ারহাট এলাকার বাসিন্দা খলিল মিয়া বলেন, বেড়িবাঁধ ভেঙে নদীর পানি ঢুকেছে। পানি আরো বাড়লে বাড়িতেও পানি ঢুকে যাবে। তখন আমরা বড় বিপদে পড়ব।”
বন্যার পানিতে ভূরুঙ্গামারী উপজেলার শিলখুড়ি, তিলাই, চর ভূরুঙ্গামারী, পাইকেরছড়া, সোনাহাট ও আন্ধারিরঝাড় ইউনিয়ন এবং নাগেশ্বরীর বামনডাঙা, কেদার, বল্লবেরখাস ও কালীগঞ্জ ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলের বিস্তীর্ণ আমন বীজতলা, পাট ও সবজিক্ষেত ডুবে গেছে। সদর ও রৌমারী উপজেলাতেও কৃষিজমি প্লাবিত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জেলায় ৪৬ হেক্টর সবজিক্ষেত, ৩৬ হেক্টর আমন বীজতলা এবং ৮৪ হেক্টর পাটক্ষেত পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, “কিছু বীজতলা ও সবজি নষ্ট হয়ে যাবে। সেগুলো নতুন করে করতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে কৃষকদের প্রণোদনা সহায়তা দেওয়া হবে।”
অন্যদিকে পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে নতুন করে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে নদীভাঙন। ধরলা, তিস্তা, দুধকুমার ও ব্রহ্মপুত্র নদের তীরজুড়ে তীব্র ভাঙন শুরু হয়েছে। গত এক সপ্তাহে এসব নদীর ভাঙনে অন্তত অর্ধশত পরিবার বসতভিটা হারিয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে বিভিন্ন এলাকায় জিও ব্যাগ ফেলার কাজ শুরু করেছে পাউবো।
পাউবোর কুড়িগ্রামের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, “সব নদীর পানিই কমছে। তবে সব নদীতেই ভাঙন রয়েছে। জনগুরুত্ব বিবেচনায় জনবসতিপূর্ণ এলাকায় অগ্রাধিকার দিয়ে জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন প্রতিরোধের কাজ চলমান রয়েছে।”
এদিকে মঙ্গলবার দুপুরে বন্যার পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানায়, আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় কুড়িগ্রাম, রংপুর, নীলফামারী, লালমনিরহাট ও গাইবান্ধা জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। বিশেষ করে কুড়িগ্রামের দুধকুমার নদের নিম্নাঞ্চলে পরিস্থিতি আবারও অবনতির আশঙ্কা রয়েছে।
পানি নামতে শুরু করলেও বন্যা ও নদীভাঙনের দ্বিমুখী সংকটে কুড়িগ্রামের হাজারো মানুষ এখনও অনিশ্চয়তা আর আতঙ্কের মধ্যেই দিন পার করছেন।