
ভারতে ভোট চুরি ও ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়া নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে প্রকাশ্যে মুখোমুখি বিতর্কের চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিলেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। কয়েক দিন আগে মোদিকে আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বিতর্কের স্থান, সময় এবং বিচারক হিসেবে যাঁকে ইচ্ছা তিনি নির্বাচন করতে পারেন; এমনকি দরকার হলে মোহন ভাগবতকেও বিচারক নিযুক্ত করা যেতে পারে। সেখানে জনতা ও সংবাদমাধ্যমের সামনে দেশপ্রেম ও দেশদ্রোহের চূড়ান্ত ফয়সালা হয়ে যাবে। সেই মঞ্চে আপনি থাকবেন, আমি থাকব, জনতা থাকবে, মিডিয়া থাকবে। কারা দেশপ্রেমী, কারা দেশদ্রোহী—সবকিছুর ফয়সালা সেখানেই হয়ে যাবে।’।
সেই সঙ্গে রাহুল গান্ধী অভিযোগ তুলেছেন, কেন দ্রুততার সঙ্গে মন্ত্রিসভাকে না জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি সম্পাদন করা হয়েছিল এবং কোন পরিস্থিতিতে মার্কিন মুলুকে শিল্পপতি আদানির বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলা বন্ধ হয়ে গেল, সেসবের জবাব এই বিতর্কের মঞ্চেই পাওয়া যাবে।
প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে ওই চ্যালেঞ্জের জবাব দেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। গত বৃহস্পতিবার হরিয়ানায় অনুষ্ঠিত এক জনসভায় তিনি বলেন, খোলা ময়দানে কোনো বিতর্কের প্রয়োজন নেই; সংসদীয় পরিবেশেই এই আলোচনা হওয়া উচিত। এমনকি এসআইআর বিষয়ে আলোচনার জন্য প্রয়োজন পড়লে সরকার সংসদের বিশেষ অধিবেশন ডাকতেও প্রস্তুত বলে জানান তিনি এবং রাহুলকে সেখানে আসার আহ্বান জানান।
অমিত শাহর পাল্টা বক্তব্যের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ এক পোস্টে তীব্র কটাক্ষ করে রাহুল গান্ধী লিখেছেন, তাঁদের তিনি পাগল করে দেবেন। বিরোধীদের মুখোমুখি দাঁড়াতে প্রধানমন্ত্রীকে বিভ্রান্ত না করে যেকোনো মঞ্চে ও সময়ে বিতর্কে অংশ নেওয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ভয় না পেয়ে যেন মোদিকে রাজি করানো হয়। আমার সঙ্গে খোলাখুলি বিতর্কে বসতে শুধু তাঁকে রাজি করান।
নিজের এই মন্তব্যের পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে অমিত শাহর ভিন্ন দুটি সময়ে দেওয়া বক্তব্যের ভিডিও ক্লিপিং পাশাপাশি প্রকাশ করেন কংগ্রেসের এই প্রভাবশালী নেতা। তিনি দাবি করেন, সরকারের ভেতরে চরম বিভ্রান্তি কাজ করছে।
রাহুলের প্রকাশ করা ভিডিও ক্লিপের প্রথমটি ছিল ২০২৫ সালের ১০ ডিসেম্বরের। সেদিন সংসদে এসআইআর সংক্রান্ত বিরোধীদের আলোচনার দাবির মুখে অমিত শাহ যুক্তি দিয়েছিলেন যে, বিষয়টি নিয়ে সংসদীয় আলোচনা সম্ভব নয়। কারণ আলোচনা চলাকালে যেসব প্রশ্ন উত্থাপিত হবে, নির্বাচন কমিশনার বা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা স্বায়ত্তশাসিত হওয়ায় সংসদে উপস্থিত থেকে জবাব দেওয়ার সুযোগ তাঁদের নেই।
অথচ এর বিপরীতে রাহুলের তুলে ধরা দ্বিতীয় ক্লিপিংয়ে দেখা যায়, গত ৫ নভেম্বরের হরিয়ানার সভায় অমিত শাহ পুরোপুরি বিপরীত অবস্থান নিয়েছেন। সেখানে মোদির পরিবর্তে নিজেকে ও সরকারকে প্রস্তুত দাবি করে তিনি বলেছিলেন, এসআইআর ইস্যুতে বিতর্কের খাতিরে বিশেষ সংসদীয় অধিবেশন ডাকতে তাঁদের কোনো আপত্তি নেই। পরের ক্লিপিংটা গত ৫ নভেম্বরের, হরিয়ানার জনসভায় অমিত শাহর ভাষণ থেকে নেওয়া। মোদির উদ্দেশে তিনি বলেছিলেন, ‘কোথায় বিতর্ক হবে, তা আপনি ঠিক করুন।
এক বছরের মধ্যে দেওয়া অমিত শাহর এই দুই রকমের বক্তব্য তুলে ধরে রাহুল গান্ধী কৌতুক সহকারে বলেন, সরকার আসলেই বিভ্রান্তিতে পড়ে গেছে এবং এভাবে সরকারি দ্বিচারিতাই প্রকাশ্যে ফুটে উঠেছে।
এই বিতর্কের জের ধরে গতকাল গভীর রাতে রাহুলকে নিশানা করে পাল্টা পোস্ট দেন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী প্রহ্লাদ যোশি। ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) আন্দোলনের তোপে ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করার পর তিনি এই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নতুন দায়িত্ব পান।
প্রহ্লাদ যোশি তাঁর পোস্টে লিখেছেন, বিভ্রান্তির মধ্যে সরকার নয়, বরং রাহুল গান্ধী নিজেই রয়েছেন। নির্বাচনে জয়ী হলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ঠিক থাকে, আর হেরে গেলেই নানা অসংগতির অজুহাত তোলা হয় বলে তিনি সমালোচনা করেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যখন সংসদে বিশেষ অধিবেশনের উন্মুক্ত প্রস্তাব দিয়েছেন, তখন এড়িয়ে না গিয়ে রাহুলের সেখানে যাওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বিজেপি নেতারা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অবস্থান সমর্থন করে মাঠে নামলেও এক বছর আগে সংসদে দেওয়া অমিত শাহর আইনি যুক্তি ও বর্তমানের অবস্থান বদল নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে জোরালো চর্চা শুরু হয়েছে। মূলত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই পরস্পরবিরোধী ভূমিকাকেই রাহুল গান্ধী মোক্ষম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন। এখন আলোচনায় রাজি থাকলে তাঁর এক বছর আগের যুক্তি অসাড় প্রতিপন্ন হয়।