
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনীর নির্যাতন ও গণহত্যার মুখে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের ঢলের নয় বছর পূর্ণ হলো আজ। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের ভয়াবহতার স্মরণে মঙ্গলবার কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পালিত হয়েছে ‘রোহিঙ্গা গণহত্যা দিবস’। দিনটিকে ‘কালো দিবস’ আখ্যা দিয়ে গণহত্যার বিচার, নাগরিক অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া এবং নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের দাবি জানিয়েছেন রোহিঙ্গারা।
‘রিফুজি জীবন ছেড়ে মিয়ানমারে ফিরতে চাই’—এমন নানা স্লোগান, ব্যানার ও ফেস্টুন নিয়ে সকাল থেকেই টেকনাফের শালবাগান রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মাঠে জড়ো হন রোহিঙ্গারা। উখিয়ার কয়েকটি ক্যাম্পেও পৃথক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এসব কর্মসূচিতে নারী-শিশুসহ বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা অংশ নেন। তাঁদের কণ্ঠে ছিল নিরাপদে নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার আকুতি।
টেকনাফের শালবাগান মাঠে সকাল ৯টায় রোহিঙ্গা সংগঠন ‘ইউনাইটেড কাউন্সিল অব রোহিঙ্গা’ (ইউসিআর) আয়োজিত সমাবেশ শুরু হয়। শুরুতে রোহিঙ্গা মৌলভী মো. ইউছুপ নিজ ভাষায় তারানা পরিবেশন করে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরেন। একই সঙ্গে দ্রুত প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
সমাবেশে ইউসিআরের সদস্য রোহিঙ্গা নেতা আবু তাহের বলেন, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নিজস্ব ইতিহাস ও ঐতিহ্য রয়েছে। যারা রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ বলে দাবি করে, তাদের সেই দাবির পক্ষে নথিপত্র ও প্রমাণ উপস্থাপন করতে হবে।
তিনি বলেন, “আমরা যে রোহিঙ্গা, তার ঐতিহাসিক ও নথিভুক্ত প্রমাণ আমাদের কাছে রয়েছে। মিয়ানমারকে রোহিঙ্গাদের পরিচয় অস্বীকারের দাবিও প্রমাণ করতে হবে।”
প্রত্যাবাসন নিয়ে দীর্ঘ অপেক্ষার কথা তুলে ধরে আবু তাহের বলেন, নয় বছরেও রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ফেরার কার্যকর কোনো পথ দেখতে পাচ্ছেন না। আলোচনার মাধ্যমে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন সম্ভব না হলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি। একপর্যায়ে তিনি বলেন, “আলোচনায় ফেরত যাওয়া সম্ভব না হলে আমরা অস্ত্র হাতে নেওয়ার জন্য প্রস্তুত।”
সমাবেশে টেকনাফের রোহিঙ্গা নেতা বদরুল ইসলাম বলেন, “২৫ আগস্ট আমাদের জন্য খুশির দিন নয়, অশান্তির দিন। ২০১৭ সালের এই দিনে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা ও নির্যাতন চালানো হয়েছিল। লাখ লাখ মানুষকে ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করে দেশ ছাড়া করা হয়। আমরা সেই গণহত্যার বিচার চাই।”
বাংলাদেশে আশ্রয় দেওয়ায় কৃতজ্ঞতা জানিয়ে লেদা ক্যাম্পের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলম বলেন, “আমরা এ দেশের অতিথি। কিন্তু অনেক দিন হয়ে গেছে। এখন আমাদের জন্মভূমিতে ফিরে যাওয়া উচিত। আমরা মিয়ানমারেই ফিরে যেতে চাই। অন্য কোনো দেশে গেলে রোহিঙ্গাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে। তাই নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসনে বিশ্ববাসীর সহযোগিতা চাই।”
উখিয়ার আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যানিটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জোবায়ের বলেন, “আমরা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ দেশ গড়তে চাই। বাংলাদেশে শরণার্থী জীবনের নয় বছর কেটেছে। এই ভাসমান জীবন থেকে মুক্তি চাই। নিজ দেশে নিরাপদ পরিবেশে ফিরে যেতে চাই।”
‘নিরাপদ প্রত্যাবাসনই একমাত্র সমাধান’
টেকনাফ রোহিঙ্গা প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি মোজাম্মেল হক বলেন, রোহিঙ্গারা বছরের পর বছর ধরে বাংলাদেশে মানবিক আশ্রয়ে রয়েছে। তাদের নিজ দেশে ফেরার পরিবেশ তৈরি করতে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়াতে হবে। নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কোনো রোহিঙ্গাকে জোর করে ফেরত পাঠানো যাবে না।
তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকট দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব শুধু ক্যাম্পে থাকা মানুষের ওপর নয়, স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও পুরো সীমান্ত এলাকার ওপর পড়বে। তাই দ্রুত প্রত্যাবাসনের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ
নিরাপদ সীমান্ত আন্দোলনের প্রতিনিধি রুবায়েত হোসাইন বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের কারণে কক্সবাজারের সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের চাপ ও নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। সীমান্তে মানবপাচার, মাদক ও অপহরণসহ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের মানবিক অধিকার যেমন নিশ্চিত করতে হবে, তেমনি বাংলাদেশের সীমান্ত ও স্থানীয় জনগণের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা জরুরি। রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের মাধ্যমে সংকটের স্থায়ী সমাধান করতে হবে।
নয় বছরেও শুরু হয়নি কার্যকর প্রত্যাবাসন
২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর কয়েক সপ্তাহে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। এর আগে বিভিন্ন সময়ে আসা রোহিঙ্গাদের সঙ্গে বর্তমানে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গার সংখ্যা ১২ লাখ ছাড়িয়েছে।
নয় বছর ধরে কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের ৩৩টি ক্যাম্পে অনিশ্চিত জীবন কাটাচ্ছেন রোহিঙ্গারা। কারও চোখে স্বজন হারানোর স্মৃতি, কারও মনে পুড়ে যাওয়া বাড়িঘরে ফেরার আকাঙ্ক্ষা। বছর ঘুরে ২৫ আগস্ট এলেই ক্যাম্পজুড়ে নতুন করে উচ্চারিত হয় স্বদেশে ফেরার দাবি। কিন্তু নয় বছরেও সেই ফেরার পথ খুলে যায়নি।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে একাধিকবার আলোচনা হলেও বাস্তবে বড় পরিসরে কোনো রোহিঙ্গা নিজ দেশে ফিরতে পারেননি। ২০১৮ ও ২০১৯ সালে প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও রোহিঙ্গাদের অনাস্থা ও মিয়ানমারের পরিস্থিতির কারণে তা বাস্তবায়িত হয়নি। এরপর মিয়ানমারের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও রাখাইন রাজ্যে চলমান সংঘাত প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বাড়ছে বাংলাদেশের চাপ
রোহিঙ্গাদের দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান বাংলাদেশের ওপর মানবিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত চাপও বাড়িয়ে চলেছে। দীর্ঘদিন ক্যাম্পে বসবাসের কারণে খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে চাপ অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সহায়তার অর্থায়ন কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, ৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত বাংলাদেশে মোট রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা ছিল ১২ লাখ ১৭১ জন। এর মধ্যে কক্সবাজারে ১১ লাখ ৬৬ হাজার ৩৫২ জন এবং নোয়াখালীর ভাসানচরে ৩৩ হাজার ৮১৯ জন অবস্থান করছিলেন।
এদিকে গণহত্যা দিবসের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন)।
১৬-আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের অতিরিক্ত ডিআইজি মুহাম্মদ কাউছার সিকদার বলেন, তাঁর আওতাধীন কয়েকটি ক্যাম্পে রোহিঙ্গারা শান্তিপূর্ণভাবে গণহত্যা দিবসের কর্মসূচি পালন করেছেন। সমাবেশে তাঁরা শরণার্থীজীবন থেকে মুক্তি, নাগরিক অধিকার এবং সম্মানজনক প্রত্যাবাসনের দাবি জানিয়েছেন।
নয় বছর আগে যারা শিশু কিংবা কিশোর বয়সে বাংলাদেশে এসেছিলেন, তাদের অনেকেই এখন কৈশোর ও যৌবন পেরিয়ে বড় হয়েছেন ক্যাম্পের পরিবেশে। নতুন প্রজন্মের একটি বড় অংশ জন্ম নিয়েছে শরণার্থী ক্যাম্পেই। ফলে ‘ফেরার অপেক্ষা’ এখন শুধু একটি পরিবারের নয়, একটি প্রজন্মের ভবিষ্যতের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রোহিঙ্গাদের ভাষায়—তারা বাংলাদেশের আতিথেয়তার প্রতি কৃতজ্ঞ, কিন্তু স্থায়ীভাবে শরণার্থী হয়ে থাকতে চান না। তাদের চাওয়া, নিজেদের পরিচয় ও অধিকার নিয়ে নিরাপদে নিজ দেশে ফিরে যাওয়া।
নয় বছর ধরে তাই ঘুরেফিরে একই প্রশ্ন—**কবে শেষ হবে এই শরণার্থী জীবনের অপেক্ষা? কবে বাস্তবে শুরু হবে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন?**
ক্যাম্পে উচ্চারিত রিফুজি জীবন ছেড়ে স্বদেশে ফিরতে চাই’ স্লোগান যেন সেই দীর্ঘ অপেক্ষা আর স্বদেশ ফেরার আকুতিরই প্রতিধ্বনি।