
রাজধানীর মুগদায় আয়োজিত এক নাগরিক সমাবেশে পুলিশের মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) বিতর্কিত ‘ক্রসফায়ার’ সংক্রান্ত মন্তব্যের কড়া সমালোচনা করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক হাসনাত আবদুল্লাহ। সোমবার বিকেলে অনুষ্ঠিত এই সমাবেশে তিনি দাবি করেন, আইজিপিকে অনতিবিলম্বে তার বক্তব্য প্রত্যাহার করতে হবে এবং জনগণের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চাইতে হবে। ২৬ অক্টোবর (সোমবার) বিকেলে রাজধানীর মুগদায় আয়োজিত এক নাগরিক সমাবেশে তিনি এই দাবি জানান। প্রত্যাহার করা না হলে আমরা ধরে নেব—তারেক রহমানের নির্দেশে তিনি এই বক্তব্য দিয়েছেন।
হাসনাত আবদুল্লাহ দাবি করেন, আইজিপির এহেন মন্তব্যের মাধ্যমে পুরো পুলিশ বাহিনীকে হেয় করা হয়েছে। তার ভাষ্যমতে, পুলিশ বাহিনী যখন সংস্কারের মাধ্যমে জনগণের আস্থার প্রতীক হতে চাইছে এবং ঘুরে দাঁড়াতে চেষ্টা করছে, ঠিক সেই সময়ে আইজিপি পুলিশকে আবারো লাঠিবাহিনী, চাঁদাবাজ ও ক্রসফায়ার সংস্কৃতিতে ফিরিয়ে নিতে চাচ্ছেন। তিনি মাঠ পর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশে বলেন, প্রিয় পুলিশ ভাই-বোনেরা, আপনারা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের স্বার্থ উদ্ধারের হাতিয়ার হবেন না, বরং জনসেবায় নিয়োজিত থাকুন। নিম্নপদস্থ পুলিশ সদস্যদের ব্যবহার করে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নিজেদের স্বার্থ হাসিল করেন। তাদের রক্ত ও পোশাক বিক্রি করে কর্মকর্তারা বিদেশে বাড়িঘর তৈরি করেন। জনগণ যখন ঘুরে দাঁড়ায়, তখন লাঠি বা বারুদ দিয়ে জনতা ঠেকানো যায় না। প্রশ্ন আসে—চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীরাই কি মন্ত্রী হয়েছে, নাকি মন্ত্রীরা সন্ত্রাসী হয়েছে। খুলনায় নিরাপত্তার অভাবে পুলিশও বের হতে ভয় পায়। মন্ত্রীদের সন্তান ও পরিবারের শিক্ষাগত ও চিকিৎসা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন হাসনাত তুলে বলেন, দেশের কতজন মন্ত্রীর সন্তান দেশে পড়াশোনা করে, তা দেখতে হবে। পারিবারিক স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির কঠোর সমালোচনা করে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, আমাদের দেশের মন্ত্রীরা মন্ত্রিত্ব পান, আর তাঁদের ভাইয়েরা ব্যবসা শুরু করেন। স্বামীরা মন্ত্রিত্ব পেলে স্ত্রীরা পান ডিলারশিপ, সন্তানরা পান ঠিকাদারি আর শালি-সমন্ধীরা ব্যবসা পান। মন্ত্রীদের কেউ যদি এ দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় বিশ্বাস না রাখেন, তবে সাধারণ মানুষের বিশ্বাস থাকবে কীভাবে। একইভাবে তারা দেশের হাসপাতালে স্বাস্থ্যসেবাও নেন না; বরং সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করেন।
সমাবেশে হাসনাত আবদুল্লাহ আইজিপির বিরুদ্ধে গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগও উত্থাপন করেন। তিনি দাবি করেন, আইজিপির বিরুদ্ধে অস্ট্রেলিয়া ও আমেরিকায় বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার করে বাড়ি কেনার অভিযোগ রয়েছে। যদিও এই অভিযোগের স্বপক্ষে তিনি কোনো দাপ্তরিক নথিপত্র বা প্রমাণ সমাবেশে উপস্থাপন করেননি।
দেশের চলমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, বর্তমান বাংলাদেশে আমরা এমন এক অবস্থায় উপনীত হয়েছি যেখানে সাধারণ নাগরিক থেকে শুরু করে মন্ত্রী পর্যন্ত কারো নিরাপত্তা নিশ্চিত নেই। ঢাকা শহরে রাত নয়টার পর মানুষ ঘর থেকে বের হতেও আতঙ্কবোধ করে। এটা আবার কেমন বাংলাদেশ, যেখানে মন্ত্রীরাও অস্ত্র নিয়ে বের হন, চাঁদাবাজরা অস্ত্র নিয়ে বের হয়, ডাকাতরা অস্ত্র নিয়ে বের হয়। বের হলে জামাকাপড় খুলে রেখে দেওয়া হয়।
রাজনীতির প্রসঙ্গে টেনে তিনি আগামী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মুগদাবাসীকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান। হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, অতীতের ভুল সংশোধন করে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা জরুরি। তিনি ২০০৬ সালে বিচারপতিদের বয়সসীমা বাড়িয়ে নির্বাচনের কৌশল নেওয়ার প্রসঙ্গ তুলে বলেন, সেই সিদ্ধান্তের কারণে বাংলাদেশকে ১৭ বছর পিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ২০০৬ ও ১৯৯৬ উভয় সময়েই বিএনপি ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল। বর্তমানে আবারো সালাহউদ্দিনের কুবুদ্ধিতে স্পিকারকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করে একটি নতুন নীলনকশা আঁকা হচ্ছে, যা দেশবাসীকে আবারো অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ২০০৬ সালে বিচারপতিদের বয়স বাড়িয়ে দিয়ে নির্বাচনের দিকে যাওয়ার চেষ্টার মাধ্যমে বাংলাদেশকে ১৭ বছর পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে, যার দায় বিএনপির ওপরই বর্তায়। সেজন্য আগামী সিটি নির্বাচনে আমাদের প্রার্থী, জনতার প্রার্থী, এনসিপির প্রার্থী এবং চাঁদাবাজ ও বিএনপির সন্ত্রাসবাদের আতঙ্ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী আপনাদের প্রতিনিধিত্ব করবেন। নিয়ন্ত্রিত সরকারব্যবস্থা গঠনের মাধ্যমে বাংলাদেশকে ১৭ বছরের অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়েছে। আশা করি, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী আপনাদের প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটাতে পারবেন। তারা শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতায় আসে, কিন্তু দেশটাকে অশান্ত ও বিশৃঙ্খল করে দিয়ে ক্ষমতা থেকে যেতে বাধ্য হয়।