
কক্সবাজারের উখিয়ার পাটুয়ারটেক সৈকতে কাঠের তৈরি টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটকের মৃত্যুর ঘটনায় ২৩ জনের বিরুদ্ধে জামিনযোগ্য ধারায় মামলা রেকর্ড করা হয়েছে। এ ঘটনায় উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমানকে আদালতে তলব করে বিচারক স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন। আদালতের মতে, ১০ পর্যটকের মৃত্যুর মতো মর্মান্তিক ঘটনায় জামিন অযোগ্য ধারা সংযোজন না করে লঘু ধারায় মামলা রেকর্ড করা গুরুতর অপরাধ। আদালতের আদেশে বলা হয়, ১৭ অক্টোবর টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটকের মৃত্যুর ঘটনায় করা মামলায় দণ্ডবিধির ৩০৪-ক, ৩৩৮ ও ৩৪ ধারা উল্লেখ করা হয়। আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, মামলার রেকর্ডিং কর্মকর্তা হিসেবে ওসি আতিকুর রহমান ‘ইচ্ছাকৃতভাবে’ এজাহার রেকর্ডের সময় ৩০৪ ধারা সংযোজন করেননি।
গত ১৭ অক্টোবর সকালে ওই রিসোর্টটিতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে ১০ জনের পুড়ে যাওয়া মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনার ৯ দিন পেরিয়ে গেলেও রিসোর্টের মূল মালিক মো. তানভীর সুলতান মিয়াসহ তিন প্রধান আসামি এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন। তবে পুলিশ এ পর্যন্ত রিসোর্টের সহকারী ব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেনকে গ্রেপ্তার করেছে। ‘আমার তিন বোনের পাঁচ–ছেলে মেয়ে মারা গেছে, ওরা ৯ জন বেড়াতে এসেছিল’। ফলে আগুনে দগ্ধ পর্যটকেরা রিসোর্টের ভেতরে আটকা পড়েন এবং বের হতে না পেরে ১০ জনের মৃত্যু হয়। অগ্নিকাণ্ড ঘটলে অতিথিরা কক্ষ থেকে বের হতে না পেরে প্রাণ হারাতে পারেন, এমন ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও তাঁরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেননি বলে আদালত উল্লেখ করেন। আগুনে পুড়ে যাওয়ায় মরদেহগুলোর পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
কক্সবাজারের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আসাদ উদ্দিন মো. আসিফ এক আদেশে ওসি আতিকুর রহমানকে আগামী ২৯ অক্টোবর সশরীর আদালতে হাজির হয়ে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে বলেছেন। দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ২১৮ ধারা অনুযায়ী কেন তাঁর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা ও বিভাগীয় শাস্তির সুপারিশ করা হবে না, আদেশে তার জবাব চাওয়া হয়েছে। কক্সবাজার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের প্রশাসনিক কর্মকর্তা শাহাজাহান এলাহী নূরী বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
নিজের বিরুদ্ধে আসা অভিযোগের বিষয়ে ওসি আতিকুর রহমান জানান, আগুন নেভানো ও উদ্ধার কাজের ব্যস্ততার কারণে এজাহারে ৩০৪ ধারা যুক্ত করা হয়নি। তবে ঘটনার পরদিন আদালতের কাছে ওই ধারা সংযোজনের আবেদন করা হয়েছে। তিনি নিজেও এই মর্মান্তিক ঘটনায় মর্মাহত বলে দাবি করেন এবং আদালতের নোটিশ পেলে নিয়ম অনুযায়ী জবাব দেবেন বলে জানান। তিনি বলেন, নোটিশের অনুলিপি ওসি আতিকুর রহমানসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোয় পাঠানো হয়েছে।
আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ওই রিসোর্টে কোনো ধরনের অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা বা জরুরি বহির্গমন পথ ছিল না।
দীর্ঘ দিন ধরে মালিকপক্ষ চরম ঝুঁকি নিয়ে রিসোর্টটি পরিচালনা করে আসছিল। আসামিদের লঘু অপরাধের ধারায় রক্ষা করার অসৎ উদ্দেশ্যে এজাহারে ৩০৪ ধারা বাদ দেওয়া হয়েছিল বলে আদালত মনে করছেন। দণ্ডবিধি ৩০৪ ধারায় অপরাধ প্রমাণিত হলে যাবজ্জীবন বা ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে, অথচ জামিনযোগ্য ৩০৪-ক ধারায় সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের সাজার সুযোগ রাখা হয়েছে। ‘বিস্ফোরণের বিকট শব্দ শুনে ছুটে এসে দেখি, রিসোর্টটি দাউ দাউ করে জ্বলছে’।
গত ১৭ অক্টোবর সকাল সাড়ে আটটার দিকে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরের মাধ্যমে আগুন লাগার খবর পায় পুলিশ। ফায়ার সার্ভিসের দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর বেলা আড়াইটার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে এবং রিসোর্ট থেকে ১০টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ইনানী পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক রিমন ঘোষ সুরতহাল তৈরি করার পর ডিএনএ পরীক্ষার জন্য মরদেহগুলো সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠান।
ওই দিন রাতে উখিয়া থানার উপপরিদর্শক আশীষ সূত্রধর অবহেলাজনিত মৃত্যুর অভিযোগে চার জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা ১৯ জনকে আসামি করে মোট ২৩ জনের বিরুদ্ধে মামলাটি দায়ের করেন। মামলার এজাহারভুক্ত চার আসামি হলেন রিসোর্টের মালিক মো. তানভীর সুলতান মিয়া, প্রধান ব্যবস্থাপক সাঈদ আহমদ, ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সাইদ এবং সহকারী ব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন সুমন। এ ছাড়া আরেক মালিক নেওয়াজ মোরশেদের নাম ভুলবশত বাদ পড়ায় তা যুক্ত করতে আদালতে আবেদন করা হয়েছে। এতে ৪ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা ১৯ জনকে আসামি করা হয়। মামলার এজাহারে নাম থাকা চার আসামি হলেন রিসোর্টের মালিক ও চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর পূর্ব গোমদণ্ডীর বাসিন্দা মো. তানভীর সুলতান মিয়া (৩৮), প্রধান ব্যবস্থাপক বরিশালের সাঈদ আহমদ (৩২), ব্যবস্থাপক উখিয়ার জালিয়াপালং এলাকার মোহাম্ম। মামলার এজাহারে নাম থাকা চার আসামি হলেন রিসোর্টের মালিক ও চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর পূর্ব গোমদণ্ডীর বাসিন্দা মো. তানভীর সুলতান মিয়া (৩৮), প্রধান ব্যবস্থাপক বরিশালের সাঈদ আহমদ (৩২), ব্যবস্থাপক উখিয়ার জালিয়াপালং এলাকার মোহাম্মদ সাইদ (৩০) এবং সহকারী ব্যবস্থাপক। 38, 32, 30, 29.
গ্রেপ্তারকৃত আসামি জাহিদ হোসেনকে গত ১৮ অক্টোবর আদালতে পাঠিয়ে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করে পুলিশ। আদালত সূত্রে জানা গেছে, ওই রিমান্ড আবেদনের শুনানির জন্য পরবর্তী দিন ধার্য করা হয়েছে এবং জাহিদকে বর্তমানে জেলা কারাগারে রাখা হয়েছে।