
কুড়িগ্রামের চর রাজিবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোগীদের জন্য বরাদ্দ সরকারি ওষুধ মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার পর রাতের আঁধারে পুড়িয়ে ফেলার অভিযোগ উঠেছে। তিন বস্তা ওষুধ পোড়ানো নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে সরকারি ওষুধের সংরক্ষণ, বিতরণ ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে। ঘটনাটি তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ।
সোমবার (১০ আগস্ট) রাতে ৫০ শয্যাবিশিষ্ট চর রাজিবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স চত্বরে এ ঘটনা ঘটে। হাসপাতাল চত্বরে ওষুধ পোড়ানোর সময় স্থানীয়রা আপত্তি জানান। পরে ছাত্রদল ও যুবদলের নেতাকর্মীরা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে বিষয়টি জানতে গেলে উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। প্রশাসনের উপস্থিতিতে পরে পরিস্থিতি শান্ত হয়। ঘটনাটির বিষয়ে একই ধরনের তথ্য সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
রোগীর ওষুধ বাইরে, সরকারি ওষুধ পড়ে নষ্ট!
চরাঞ্চলের দরিদ্র মানুষের চিকিৎসার অন্যতম ভরসা রাজিবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। স্থানীয়দের অভিযোগ, হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা অনেক রোগী প্রয়োজনীয় সরকারি ওষুধ পান না। বিনামূল্যে ওষুধ পাওয়ার আশায় হাসপাতালে এলেও শেষ পর্যন্ত বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে হয় তাদের।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, যে ওষুধ দরিদ্র রোগীদের বিনামূল্যে দেওয়ার কথা, সেই ওষুধই কীভাবে মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে কয়েক বস্তা নষ্ট হলো?
শুধু তাই নয়, মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার আগে এসব ওষুধ রোগীদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছিল কি না, হাসপাতালের মজুত ব্যবস্থাপনায় কোনো গাফিলতি ছিল কি না এবং ওষুধের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে সমন্বয় ছিল কি না—এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় আসার দাবি উঠেছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, সোমবার রাতে হাসপাতাল চত্বরে ওষুধ পোড়ানো হচ্ছে—এমন খবর পেয়ে রাজিবপুর সদর ইউনিয়ন যুবদলের সদস্যসচিব আল আমিনসহ কয়েকজন সেখানে যান। তারা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে বিষয়টি জানতে চান। এ সময় সেখানে হইচই শুরু হয়।
আল আমিন বলেন, ‘রাতের আঁধারে তিন বস্তা সরকারি ওষুধ পোড়ানো হচ্ছে—এমন খবর পেয়ে আমরা ঘটনাস্থলে যাই। সেখানে গিয়ে তিন বস্তা ওষুধ পড়ে থাকতে দেখি।’ প্রকাশিত প্রতিবেদনেও তিন বস্তা ওষুধের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
‘কাগজ পোড়াতে গিয়ে ওষুধ পাওয়া যায়’
তবে ওষুধ পোড়ানোর অভিযোগের বিষয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সারওয়ার জাহান।
তার দাবি, হাসপাতাল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য কিছু পুরোনো কাগজপত্র পুড়িয়ে ফেলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। এ সময় কিছু পুরোনো মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ পাওয়া যায়। এসব ওষুধ করোনাকালের বলে দাবি করেন তিনি।
কিন্তু এখানেই প্রশ্ন উঠেছে—মেয়াদোত্তীর্ণ সরকারি ওষুধ ধ্বংস করার নির্ধারিত প্রক্রিয়া কী ছিল? কার অনুমোদনে সেগুলো হাসপাতাল চত্বরে পোড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল?
কুড়িগ্রামের সিভিল সার্জনও জানিয়েছেন, এভাবে সরকারি ওষুধ পোড়ানোর নিয়ম নেই। ফলে বিষয়টি এখন শুধু মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের নয়; বরং সরকারি ওষুধ ব্যবস্থাপনার নিয়ম মানা হয়েছিল কি না, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
সরকারি টাকায় কেনা ওষুধে ‘বেসরকারি মোড়ক’!
ঘটনার পর সরকারি অর্থে কেনা ওষুধের কিছু প্যাকেটের মোড়ক নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, ওষুধগুলোর উৎস, সরবরাহকারী, ক্রয় প্রক্রিয়া এবং হাসপাতালের মজুত খাতার সঙ্গে বাস্তব মজুত মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
তবে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
তদন্তে তাই শুধু পোড়ানো ওষুধের পরিমাণ নয়, ওষুধগুলোর ব্যাচ নম্বর, মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ, সরবরাহের সময়, মজুত রেজিস্টার এবং বিতরণের হিসাব খতিয়ে দেখা জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
ঘটনাস্থলে ইউএনও, সংগ্রহ করা হয় নমুনা
ঘটনার খবর পেয়ে রাজিবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) সায়েকুল হাসান খান ঘটনাস্থলে যান। তিনি ওষুধ ও অন্যান্য সরঞ্জাম সরেজমিনে পরিদর্শন করেন এবং নমুনা সংগ্রহ করেন।
তিনি বলেন, ‘বিষয়টি স্বাস্থ্য বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছি। তারা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।’
তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি
এদিকে ঘটনাটি নিয়ে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ। তদন্ত দল ইতোমধ্যে মাঠে কাজ শুরু করেছে।
কুড়িগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. স্বপন কুমার বিশ্বাস বলেন, ‘এভাবে ওষুধ পোড়ানোর কোনো নিয়ম নেই। এ ঘটনায় তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। ইতোমধ্যে তদন্ত দল মাঠে কাজ করছে। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এখন তদন্ত প্রতিবেদনের দিকে তাকিয়ে স্থানীয়রা। কারণ প্রশ্ন শুধু রাতের আঁধারে সরকারি ওষুধ পোড়ানো নিয়ে নয়—দরিদ্র রোগীদের জন্য বরাদ্দ ওষুধ কেন সময়মতো বিতরণ হলো না, কীভাবে সেগুলো মেয়াদোত্তীর্ণ হলো এবং শেষ পর্যন্ত কার সিদ্ধান্তে সেগুলো ধ্বংসের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল—তার উত্তরও খুঁজছে তদন্ত।
তদন্তে এসব প্রশ্নের উত্তর বেরিয়ে এলে সরকারি ওষুধ ব্যবস্থাপনায় কোনো অনিয়ম বা গাফিলতি ছিল কি না, সেটিও স্পষ্ট হবে।