
মওদুদী মতবাদ ও জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হকের অবস্থান স্পষ্ট করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রখ্যাত আলেম ও ধর্মীয় বিতার্কিক মাওলানা নুরুল ইসলাম ওলীপুরী। হবিগঞ্জের মাদ্রাসা নূরে মদিনার পরিচালক ওলীপুরী সম্প্রতি মামুনুল হকের তিন মুরুব্বির কাছে ছয় পৃষ্ঠার একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। এতে তিনি দেওবন্দি আদর্শ, কওমি ঐতিহ্য ও সমসাময়িক রাজনৈতিক নানা ইস্যু নিয়ে ব্যাখ্যা চেয়েছেন। এতে বিষয়টি নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। দলগুলো নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয় বজায় রেখেই সম্মিলিতভাবে কাজ করার বিষয়ে একমত হয়েছে।
চিঠিটি পাঠানো হয়েছে মামুনুল হকের তিন মুরুব্বি—মিরপুরের মাদ্রাসা দারুর রাশাদের শিক্ষাসচিব মাওলানা লিয়াকত আলী, গাজীপুরের অধ্যক্ষ মিজানুর রহমান চৌধুরী (দেওনার পীর) এবং মামুনুল হকের বড় ভাই মাওলানা মাহফুজুল হকের কাছে। এর আগে গত ৬ সেপ্টেম্বর জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে একই তিন মুরুব্বির কাছে বগুড়া জামিল মাদ্রাসার সিনিয়র মুহাদ্দিস মাওলানা আব্দুল হক আজাদ একটি চিঠি লিখেছিলেন। তবে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত তিনি কোনো উত্তর পাননি বলে জানিয়েছেন। তবে বৃহস্পতিবার তিনি জানিয়েছেন, দুই মাস পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত চিঠির কোনো জবাব পাননি।
মাওলানা নুরুল ইসলাম ওলীপুরী তার চিঠিতে মামুনুল হকের সাম্প্রতিক কিছু বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেছেন।
ওলীপুরীর দাবি, মামুনুল হক এক বক্তব্যে চার মাজহাব—হানাফি, মালেকি, শাফেয়ি ও হাম্বলির আকিদার সঙ্গে সালাফি ও মওদুদীবাদের আকিদার তেমন কোনো পার্থক্য নেই বলে মন্তব্য করেছেন। তবে ওলীপুরী মনে করেন, এই দুইয়ের মধ্যে ব্যাপক ও মৌলিক পার্থক্য বিদ্যমান। তার শঙ্কা, এমন মন্তব্য কওমি শিক্ষার্থীদের বিভ্রান্ত করতে পারে এবং তাদের মওদুদীবাদ ও সালাফিবাদের দিকে ধাবিত করতে পারে।
চিঠিতে জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনি প্রতীক ‘দাঁড়িপাল্লা’কে ইনসাফ ও ওলামায়ে কেরামের প্রতীক হিসেবে আখ্যায়িত করার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন ওলীপুরী। যেসব দল অতীতের বিভিন্ন সময়ে সাহাবা ও আকাবিরদের সঙ্গে বে-ইনসাফি করেছে, তাদের প্রতীক কেন আলেমদের প্রতীক হবে—এমন প্রশ্ন রেখেছেন তিনি। এছাড়া, দেওবন্দি ও হানাফিদের আকিদা সংশোধনের আহ্বানকে অনভিপ্রেত এবং শত বছরের ঐতিহ্যের ওপর আঘাত বলে অভিহিত করেছেন এই আলেম।
জামায়াতের সঙ্গে রাজনৈতিক ঐক্যের পক্ষে শাইখুল হিন্দ (রহ.)-এর কংগ্রেসের সঙ্গে জোটের নজির উপস্থাপনের বিষয়েও ওলীপুরী দ্বিমত পোষণ করেছেন। তার মতে, ওই ঐতিহাসিক নজিরের সঙ্গে বর্তমান রাজনৈতিক ঐক্যের তুলনা যথাযথ নয়। তিনি চিঠিতে উল্লেখ করেছেন, মাওলানা মামুনুল হকের বাবা শায়খুল হাদিস মাওলানা আজিজুল হক (রহ.) তার বুখারি শরিফের ব্যাখ্যাগ্রন্থে মওদুদীবাদের কঠোর সমালোচনা করেছিলেন।
চিঠিতে ‘আকিদাতুল জিহাদিয়া’ পরিভাষা ব্যবহারের শাস্ত্রীয় ভিত্তি এবং দেওবন্দি আকিদার সঠিক ব্যাখ্যা নিয়েও মামুনুল হকের কাছে স্পষ্ট উত্তর চেয়েছেন মাওলানা নুরুল ইসলাম ওলীপুরী।
উল্লেখ্য, মাওলানা আব্দুল হক আজাদ যখন গত ৪ সেপ্টেম্বর মামুনুল হকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন, তখন মামুনুল হক বলেছিলেন, তার কর্মকাণ্ড নিয়ে কোনো আপত্তি থাকলে যেন তা তার তিন মুরুব্বির কাছে পেশ করা হয়।
মুরুব্বিরা যে সিদ্ধান্ত দেবেন, তিনি তা মেনে নেবেন।
সেই বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতেই এই চিঠির প্রক্রিয়া শুরু হয়।
দেশের কওমি ধারার ইসলামি দলগুলোর বর্তমান রাজনৈতিক মেরুকরণের প্রেক্ষাপটে এই চিঠি বাড়তি গুরুত্ব পেয়েছে। হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী কওমি ধারার দলগুলোকে এক প্ল্যাটফর্মে আনতে উদ্যোগী হয়েছেন। এর ধারাবাহিকতায় গত ২২ অক্টোবর রাজধানীর খিলগাঁওয়ের মাখযানুল উলুম মাদ্রাসায় সাতটি দলের লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সভায় ‘সমমনা ইসলামী দল’ নামে অভিন্ন ব্যানারে কার্যক্রম চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এই নতুন জোটে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, ইসলামী ঐক্যজোট (রাজী), বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি এবং বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে দলগুলোর রাজনৈতিক অবস্থান অভিন্ন নয়। জমিয়ত বিএনপি জোটে থাকলেও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও নেজামে ইসলাম পার্টি জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটে সক্রিয় রয়েছে। আগামী ৫ ডিসেম্বর এসব দলের পরবর্তী বৈঠক আয়োজনের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। প্রসঙ্গত, সংসদ নির্বাচনের আগে জামায়াতে ইসলামী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ ১১টি দলকে নিয়ে গঠিত হয়েছিল ১১ দলীয় নির্বাচনি জোট। বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের সঙ্গে আসন সমঝোতার আলোচনা হলেও শেষ পর্যন্ত দলটি আটটি আসনে এককভাবে নির্বাচন করে।