
গোমতীর পানি বাড়ছে শুনলেই বুকটা মুচড়িয়ে উঠে। গত বন্যার লোকসান এখনো কাটাইয়া উঠতাম পারছি না। আবারও যদি নদীর পানি বাইড়া পাড় ভাইঙ্গা বন্যা হয়, তাহলে আমরার উপায় থাকতো না।’
চোখেমুখে আতঙ্ক নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন গোমতী তীরবর্তী কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার মালাপাড়া ইউনিয়নের বাসিন্দা এরশাদ মিয়া। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে নদীর পানি বৃদ্ধির খবরে তার মতো নদীপাড়ের বাসিন্দাসহ উপজেলার ভিবিন্ন এলাকার লোকজনের মাঝে ফিরে এসেছে ২৪ সালের আগস্টের ভয়াবহ বন্যার স্মৃতি।
২০২৪ এর আগস্টে গোমতী নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে বুড়িচং ও ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলায় স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছিল। মুহূর্তেই তলিয়ে গিয়েছিল বিস্তীর্ণ জনপদ। এর ফলে মাঠভর্তি পাকা ধান ও অন্যান্য ফসল, মাছের খামার, গবাদিপশুর খামার, ঘরবাড়ি এবং সড়ক-যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্হ হয়েছিল। সে ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই আবারও নদীর পানি বৃদ্ধির খবরে নতুন করে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার গোমতী নদীর তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, এখনো নদীর পানি বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে বিপৎসীমা অতিক্রম না করলেও চরাঞ্চলের অনেক জমি ইতোমধ্যে পানিতে তলিয়ে গেছে। নদীর তীরবর্তী বাসিন্দারা সার্বক্ষণিক পরিস্থিতির উপর নজর রাখছে। চরে ডুবে যাওয়া ফসল রক্ষায় স্থানীয় কৃষকরা কাজ করছে। নদীর তীরের অনেক বাসিন্দা আগেই গবাদিপশু ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছে।
কুমিল্লা পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, উজানের ঢলে গোমতী নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে শুক্রবার থেকে পানি কমতে শুরু করেছে। তবুও পানি উন্নয়ন বোর্ড সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। বৃষ্টি ও উজানের ঢল অব্যাহত থাকলে হয়তো পানি আবারও বাড়তে পারে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, ২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যার ক্ষতচিহ্ন এখনো পুরোপুরি মুছে যায়নি। সেই স্মৃতি বুকে নিয়েই নদীপাড়ের মানুষসহ ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার বাসিন্দারা এবারও বর্ষাকালের প্রতিটি দিন পার করছেন শঙ্কা আর উদ্বেগের মধ্যে। তাদের একটাই প্রত্যাশা আর যেন নদীর বাঁধ ভেঙে ফিরে না আসে সেই বিভীষিকাময় ভয়াবহ বন্যা।
স্থানীয় বাসিন্দা আবদুল মালেক বলেন, ‘গত বছরের বন্যায় আমার ৬৩ শতক জমির পাকা ধান বন্যার পানিতে ডুইব্বা নষ্ট অইয়া যায়। এই কারণে অনেক বড় ক্ষতি অইছে। অহন আবার পানি বাড়তাছে হুইন্না রাইতে ঘুম আইয়ে না। আল্লাহ যেন আর ওই অবস্থা না দেহায়।’
নদী তীরের আরেক স্থানীয় বাসিন্দা রফিক মিয়া বলেন, ‘গত বন্যায় ঘরের ভেতরে হাডু পানি আছিল। বাচ্চাকাচ্চা লইয়া অনেক কষ্ট করছি। অনেক জিনিসপত্র নষ্ট অইছে। পুকুরের মাছ, ক্ষেতের পাকনা ধান নষ্ট অইছে। অহন গোমতীর পানি বাড়তাছে হুনলেই ডর লাগে। নদীর পানি বাড়তাছে হুনলেই মনে অয় আবার হগলতা ডুইব্বা যাইবো।’
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আব্দুল মতিন বলেন, ‘উজান থেকে নেমে আসা ঢল আর কয়েকদিনের বৃষ্টির কারণে গোমতী নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে চরাঞ্চলে পানি প্রবেশ করেছে। আমরা সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। নদী তীরবর্তী চরাঞ্চলের কৃষকদের সতর্ক থাকতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে কৃষি বিভাগের মাঠকর্মীরা প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছেন। কম সময়ের মধ্যে পানি কমে গেলে ফসলের তেমন কোনো ক্ষয়ক্ষতি হবে না বলে আশা করছি।’
কুমিল্লা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ রাশেদ শাহরিয়ার জানান, গতকাল পর্যন্ত গোমতী নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত ছিল। তবে আজ থেকে পানি কমতে শুরু করেছে। তবুও সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। দুর্যোগ মোকাবিলায় সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।